ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 1 month ago

দেখুন কীভাবে মুসলিম দেশটি হয়ে গেল ইহুদির !



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

এই কিছু দিন আগে লন্ডনে সিনেমাটির প্রথম শো হয়ে গেল, যাকে বলে ‘প্রিমিয়ার’। দর্শকরা সকলে অভিভূত, বিস্মিতও। এত সাংঘাতিক কথাটা যে এত সহজভাবে বলা যায়, কেউ কল্পনা করেননি। সিনেমায় দেখা গেল একটি ব্রিটিশ পরিবারের কাহিনী, যাদের পদবি ‘জনি’। জনি-দের কাছে এক সকালে সরকারের নোটিস এসে পৌঁছল যে, তাদের বাড়ি তাদের ছেড়ে দিতে হবে, এবার থেকে বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে তাদের থাকতে হবে, ওই বাড়িটির বাসিন্দা হবেন স্মিথ পরিবার।

 

আদেশক্রমে স্মিথেরা এসেও গেলেন যথাসময়ে, জনিরা বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে ব্যাকইয়ার্ডে মাথা গুঁজলেন। ক্রমে দেখা গেল, জনি পরিবারের জন্য কারও কোনও মাথাব্যথা নেই, রাষ্ট্রিক, সামাজিক কিছুমাত্র বন্দোবস্ত নেই, তারা খাবার-দাবার পান না, স্কুল-কলেজ যেতে পারেন না, অসুখ হলে ওষুধও পান না, সব রকম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কাউকে কিছু বলার জায়গাও নেই, কেননা তাদের নাগরিকত্বই নেই। ব্রিটেনের সঙ্গে পুরো দুনিয়া মেনে নিয়েছে, এভাবেই তাদের জীবন কাটাতে হবে, আর তাদের এত দিনের সাধের ঘরবাড়ি জুড়ে বিলাসে বাস করবেন স্মিথরা।- সিনেমাটির নাম? ‘১০০ বেলফোর রোড’।

৬৭ শব্দের চিঠিতে মুসলিম দেশ হয়ে গেল ইহুদি

৬৭ শব্দের চিঠিতে মুসলিম দেশ হয়ে গেল ইহুদিদের

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় অবলম্বনে বাংলা রিপোর্ট ডটকম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো সেই ঘটনা-

 

পৃথিবীর অন্যতম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ এবং ইসরাইল-প্যালেস্টাইন সমস্যার উৎসকে এইভাবে একটা পাশের বাড়ির গল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরাটা সত্যিই অসাধারণ। বেলফোর ডিক্লারেশনের শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবেই এই ছবির প্রদর্শন। এ ঘটনা অনেকেই জানি, তবু চেনাশোনা সাহেবসুবোর নাম দিয়ে ঘটনাটা বর্ণনা না করলে আমাদের মাথায় ব্যাপারটা ঠিকমত ঢোকে না। ‘আমাদের’ তো এটাই মুশকিল। বিপদটা ‘আমাদের’ না হয়ে ‘ওদের’ হলে বিপদের চরিত্র বা গুরুত্ব আমরা কিছুতেই বুঝতে পারি না!

 

সেদিন ওই ফিল্মের দর্শকরা সকলেই মনেপ্রাণে ইসরাইলবিরোধী, প্যালেস্টাইনের সমর্থক, না হলে ফিল্ম শো-টির ধারও মাড়াতেন না তারা। ঠিক যেমন, আজ, বেলফোর ডিক্লারেশনের শতবর্ষ পালনে যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র ডাকা ডিনারে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য অভ্যাগতরা ঘর আলো করবেন, গোটা শহর তখন ফেটে পড়বে আন্দোলনে বিক্ষোভে।

 

দাবি উঠবে, ডিনার না খেয়ে বেলফোর হয়ে ক্ষমা চাক ব্রিটেন। বিরোধী লেবার নেতা জেরেমি করবিন ডিনারের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে প্রতিবাদ জানাবেন। আজও এতটাই তীব্র রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক বিভেদ এই বিষয়কে ঘিরে। এতটাই আক্রমণ, এতটাই রক্তক্ষরণ প্যালেস্টাইনের নামে। আর এইসব কিছুরই সূচনা— একশো বছর আগে, ২ নভেম্বর ১৯১৭, ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারি লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর (সঙ্গে তার ছবি) লেখা চিঠিটি: বেলফোর ডিক্লারেশন।

৬৭ শব্দের চিঠিতে মুসলিম দেশ হয়ে গেল ইহুদি

ব্রিটিশ জিউইশ (ইহুদি) কমিউনিটির নেতা লর্ড রথসচাইল্ডকে সম্বোধন করা ওই চিঠিতে ছিল ৬৭টি মাত্র শব্দ। কিন্তু ওই কয়েকটি শব্দই এক পৃথিবী আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন। অটোমান তুর্কিরা হেরে গেলে মধ্য-পশ্চিম এশিয়ার ভাগাভাগিটা কেমন হবে, বুঝতে না পেরে তখন হিমশিম খাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জের ব্রিটেন, ক্লেমেন্সুর ফ্রান্স আর প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের আমেরিকা। রাশিয়াও দলে আছে, তবে এমনই কপাল, রুশ বাহিনীর অবস্থা সেই সময় সঙ্গিন।

 

তাদের দেশে তখন রুশ বিপ্লবের বিধ্বংসী উত্থান, মাত্র ক’দিন পর ৭ নভেম্বর রচিত হবে দুনিয়া-কাঁপানো ইতিহাস। এরই মধ্যে মনে হলো, জায়নবাদী অর্থাৎ ইহুদি গরিমার ধ্বজাধারীদের তুষ্ট করে পশ্চিম এশিয়ায় প্যালেস্টাইন অঞ্চলটা কবজা করলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রভূত লাভের সম্ভাবনা। সুতরাং, আর দেরি নয়। ইহুদিদের ‘বঞ্চনা’র প্রতিকারে যারা ইহুদি বাসভূমি চাইতেন, সেই জায়নবাদীদের ‘হোমল্যান্ড’ দাবি মেটাতে এবার তারা উঠে-পড়ে লাগলেন। উদ্‌ব্যস্ত দ্রুততায় তৈরি হলো পরিকল্পনা: তারই প্রথম রূপ মিলল বেলফোরের চিঠিতে।

 

ইহুদি হোমল্যান্ড? কোথায় সেটা? কেন, বাইবেল-কথিত ‘হোলি ল্যান্ড’ অর্থাৎ জেরুজালেমের চেয়ে ভাল জায়গা আর কী? যদিও তখন তার নাম প্যালেস্টাইন, যদিও তখন সেখানে একগাদা অন্য ধর্মের মানুষ, তাতে কী, সেখানেই হোক ‘ন্যাশনাল হোম ফর দ্য জিউইশ পিপল’! যদিও অন্য লোকগুলো সংখ্যায় বহু বেশি, মোট অধিবাসীর ৯০ শতাংশ, তাতেই বা কী! বেলফোর বলে দিলেন, ইহুদি বসবাসের ঢালাও ব্যবস্থা হোক, শুধু ‘অ-ইহুদি’গুলির বেশি ঝামেলা না হলেই হলো।

 

না, ঝামেলা আর কিসের! শুরু হলো হোমল্যান্ড তৈরির ‘ঝামেলাহীন’ পদ্ধতি, ব্রিটিশ সেনার বন্দুক-বেয়নেটের খোঁচায় ৯০ শতাংশকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে উৎখাত হতে হলো ১০ শতাংশের জন্য, স্মিথদের জন্য জনিদের যেমন করতে হয়েছিল। যুদ্ধ নয়, জাতিদাঙ্গা নয়, কেবল ঠাণ্ডা মাথার উপনিবেশিক ছক— নিজ ভূমি থেকে উচ্ছিন্ন হলো কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি মুসলমান। দলে দলে ইহুদিরা আসতে শুরু করল নানা দেশ থেকে। নাত্‌সি ভয়ংকরতার পর বেড়ে গেল নববাসিন্দাদের ঢল, বেড়ে গেল ইহুদিদের প্রতি বিশ্বজোড়া সহমর্মিতা।

৬৭ শব্দের চিঠিতে মুসলিম দেশ হয়ে গেল ইহুদি

ইহুদি-অনুকম্পা প্রবাহের মধ্যে সর্বৈব চাপা পড়ে গেল ফিলিস্তিনিদের অবর্ণনীয় দুরবস্থা, তারা যেন ইতিহাসের বলিপ্রদত্ত। ‘ওয়ান নেশন সলেম্‌নলি প্রমিসড্ টু আ সেকেন্ড নেশন দ্য কান্ট্রি অব আ থার্ড’: বেলফোর নথি নিয়ে আর্থার কোয়েসলারের অবিস্মরণীয় সেই উক্তি। অসামান্য আত্মদম্ভে ভরপুর এক রাষ্ট্র জন্ম নিল ক্রমে, ১৯৪৮ সালে, যার নাম ইসরাইল, জাতি বিদ্বেষ যার পরতে পরতে প্রোথিত। ফিলিস্তিনিদের জন্য পড়ে রইল কেবল নির্যাতনের বাস্তব, বাস্তবের প্রতিবাদ, প্রতিবাদের সংগ্রাম, সংগ্রামের সন্ত্রাস— প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

 

একদিক দিয়ে দেখলে বেলফোর নিমিত্তমাত্র, ইহুদি হোমল্যান্ড তৈরি বৃহত্তর ইতিহাসেরই এক আবশ্যিক ফল। তবু, অন্য দিকটা, মানে, বেলফোরের চিঠি ও ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকাটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার কুৎসিততম অধ্যায় এই বেলফোর ডিক্লারেশন। যে অমিত স্পর্ধা আর অলজ্জিত জাতি বিদ্বেষ এই একটি ঘটনার পেছনে রয়েছে, তাতে বলাই যায় যে, এমন সচেতন সুপরিকল্পিত অন্যায় মানব-সভ্যতার ইতিহাসে বেশি ঘটেনি। বেলফোরের চিঠির খোঁচায় অত বড় একটা মুসলিম সভ্যতা ‘অ-ইহুদি’ অভিধার অসম্মানজনক কোটরে নির্বাসিত হয়ে গেল, মানুষগুলি আর কোনও দিন ‘পিপল’ বলে স্বীকৃত হতে পারল না, কেননা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভাষায় ইসরাইল হলো, ‘আ ল্যান্ড উইদাউট আ পিপল ফর আ পিপল উইদাউট আ ল্যান্ড।’

 

১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭, ১৯৬৭ থেকে ২০১৭: হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নয়তো অলক্ষ্য আগ্রাসন— ইসরাইল ক্রমে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম মহাশক্তিধর দেশ হিসেবে মেলে ধরল। তার পেছনে আশ্বাস ও আশ্রয়ের পাখা মেলে দাঁড়িয়ে রইল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। কার সাধ্য ইসরাইলকে চটায়! আজও তাই হাতে-গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া কেউ প্যালেস্টাইনের অস্তিত্বটুকু মানতে রাজি নয়। ব্রিটেন তো নয়ই।

 

বেলফোর বন্দোবস্তের লকলকে শিখায় আজও পুড়ে খাক হচ্ছে সিরিয়া থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূমি, তার গনগনে আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে অস্ত্রের শাণিত ঝলকে, আজীবন প্রতিশোধের রক্তাক্ত শপথে।

 

থেরেসা মে-রা অবশ্যই এ সব কথা ভুলে গিয়ে আজ রাতে ডিনার খাবেন। হাজার হোক, সাদা সভ্যতার উপনিবেশিক দণ্ড চালনার মহামুহূর্তের শতবার্ষিকী ডিনার: যে-সে ব্যাপার নয়!

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএম