ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 weeks ago

দ্বি-পাক্ষিক নয়, বহু পাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে!



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক

আলোচিত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক নয় বরং বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই চলমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকগন।

 

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিচয়কে স্বীকৃতি দিতে মিয়ানমার সরকারের অনিচ্ছা থেকে সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মতো রোহিঙ্গারাও বসবাস করে এলেও সরকার তাদের বহিরাগত বাঙালি বলে পরিচিত করার চেষ্টা করে আসছে। অথচ দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনে এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু ১৯৭৮ সালে সামরিক বাহিনী পরিচালিত এক অভিযানে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে।

 

একপর্যায়ে সংখ্যাটি দু’লাখের ওপর পৌঁছে যায়। দীর্ঘ কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে মিয়ানমার এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীন আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে যায়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতির বিষয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ উদ্যোগ না নিয়ে বরং ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করেছিল যা রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে নাগরিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত করেছে। ১৯৯১-৯২ দু’দেশের সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কারণে। এবার এ সংখ্যা আড়াই লাখে গিয়ে পৌঁছায়। কূটনৈতিক দরকাষাকষির মধ্য দিয়ে তখন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইউএনএইচসিআরের উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাসকারী নিবন্ধিত ২৫ হাজার মানুষ ছাড়া সব রোহিঙ্গাই সে সময় প্রত্যাবাসিত হয়েছিল। নিবন্ধিত এ রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই করার নামে মিয়ানমার কালক্ষেপণ করেছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে ওদেশে বসতি গেড়েছে মিয়ানমারের এ ধররের যুক্তি সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে বলে বলা যায়।

কিন্তু ২০১২ সালের শেষদিকে আবারও নতুন করে মিয়ানমারের সেনাবহিনী রোহিঙ্গাদের হত্যা-ধর্ষণ ও বাড়িঘরে আগুন দেয়া শুরু করলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে। মাঝখানে বিরতি দিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে নতুন করে উদ্বাস্তু স্রোত বাংলাদেশের দিকে আসতে থাকে। গত ২৫ আগস্ট থেকে তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী অনেকটা যেন নিয়ম করে তার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। যখনই তা বড় আকারে শুরু হয় তখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের দিকে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসে। এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাদের দুর্দশার বিষয় স্থান পায়। কিন্তু তথাকথিত শান্তির সময়ও যে উদ্বাস্তু আগমন হয় তা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশের মধ্যে বোঝা যায়। ইদানীং আরেকটি দিক রোহিঙ্গা নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেখা যাচ্ছে। রাখাইনের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কিছু ভিক্ষুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ আসছে, যা আগে কখনই শোনা যায়নি।

 

মিয়ানমার সরকার ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে ‘আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল’ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত না থাকলে মিয়ানমার মূল সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী নাও হতে পারে।

 

মঙ্গলবার ঢাকায় ‘রোহিঙ্গা সঙ্কট: বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ কথা বলেন তিনি।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গাদের আংশিক ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল হতে পারে। মিয়ানমার নিজস্ব যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য প্রত্যাবাসন প্রত্যাশীদের সংখ্যা সীমিত করার এবং নানা অজুহাতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে বিলম্বিত করতে পারে।”

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি গত মাসে পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে বলেন, ১৯৯২ সালে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ‘যাচাইয়ের মাধ্যমে’ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রাখাইনের মুসলমানদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছে তার দেশ।

 

 

সু চির দপ্তরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে চলতি মাসের শুরুতে ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকেও একই প্রস্তাব তুলে ধরেন।

 

রাখাইনে কয়েকশ বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও  ১৯৮২ সালে আইন করে তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাই রোহিঙ্গাদের বর্ণনা করে আসছেন ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ ও ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে।

 

সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা চার লাখের মত রোহিঙ্গা গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। আর গত ২৫ অগাস্ট রাখাইনে নতুন করে দমন অভিযান শুরুর পর আরও পাঁচ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

 

বেশ কিছুদিন কূটনৈতিক আলোচনার পর ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি  প্রত্যাবাসন চুক্তি করে, যেখানে রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমার সমাজের সদস্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

 

ওই চুক্তির আওতায় মিয়ানমার সে সময় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়। চুক্তি নির্ধারিত যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও ২৪১৫ জন শরণার্থীকে সে সময় মিয়ানমার থেকে আসা বলে চিহ্নিত করা হলেও মিয়ানমার তাদের আর ফিরিয়ে নেয়নি।

 

সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, যে প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের চুক্তির নীতিমালা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াগুলো ঠিক করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার তুলনায় অনেকটাই আলাদা। সুতরাং ওই চুক্তি অনুসারে এবার রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়।

 

এ কারণে মিয়ারমারের মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রস্তাব করে তার খসড়া হস্তান্তর করা হয়। সে বিষয়ে মিয়ানমারের জবাব এখনও বাংলাদেশ পায়নি।

 

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলায়তনে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে গোলটেবিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলিতভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে সু চির এনএলডি সরকার রাখাইনে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও জীবন যাপনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে এবং সামরিক বাহিনী নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

 

“এবং তারা যেন বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাধ্য হয়, বাংলাদেশ সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।”

মাহমুদ আলী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, মিয়ানমারে মূল সমস্যার সমাধান এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ থেকে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া।

 

তিনি বলেন, প্রথম ক্ষেত্রে মূল সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরকিত্বসহ অন্যান্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বৈষম্যমূলক নীতির অবসান ঘটিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনরে সুযোগ করে দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অপপ্রচার, ধর্মীয় বিদ্বেষ, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে; ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

 

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ প্রয়োগ না করলে মিয়ানমার মূল সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হবে বলে মনে হয় না। নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও তৎপর হতে হবে।”

সঙ্কটের দ্বিতীয় অংশে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী’ হিসেবে বর্ণনা করেন মাহমুদ আলী।

 

তিনি বলেন, “এ ব্যাপারেও মিয়ানমারকে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। সেখানে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরবিশে সৃষ্টি করতে হবে। নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তা না পেলে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে আগ্রহী হবে না। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা এখন কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই। এটি এখন আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ পেয়েছে।

 

“তাছাড়া এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। এ সমস্যার পেছনে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। সমস্যার সৃষ্টি ও কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে নিহিত।”

আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারি ও সহযোগিতা ছাড়া মিয়ানমারকে দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রাখা ‘কঠিন হবে’ মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে, বহুপক্ষীয়, আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর এ কূটনৈতিক তৎপরতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সমর্থন রয়েছে।

 

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/ওবাইদ