ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 weeks ago

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নিরাপত্তার জন্য কী হুমকি?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। আগে পরে সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নতুন করে নির্যাতন ও ঘর-বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনায় রোহিঙ্গাদের আসার ঢল থামছে না। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা কথা উঠছে। অথচ যেদিন আনান কমিশনের রিপোর্ট মিয়ানমারের ক্ষমতাধর নেত্রীর হাতে পৌঁছল সেদিনই ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এর রহস্য এখনো অজানাই। এদিকে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমার নাগরিকদের দ্বারা নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে কক্সবাজার জেলার মোট জনসংখ্যার ২০ থেকে ২৫ ভাগই রাখাইন জনগোষ্ঠী।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমরা অবৈধভাবে অবস্থান করছে, যারা ভবিষ্যতে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা মিয়ানমার সীমান্তে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও মানব পাচার, চোরাচালান, সীমান্তে মাদক উৎপাদনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত।

 

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বাজেট অধিবেশনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের ইস্রাফিল আলমের (নওগাঁ-৬) প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মিয়ানমার নাগরিকরা বিভিন্ন প্রকার অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমার নাগরিকদের দ্বারা নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে কক্সবাজার জেলার মোট জনসংখ্যার ২০ থেকে ২৫ ভাগই রাখাইন জনগোষ্ঠী।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মিয়ানমার নাগরিকরা সীমান্ত এলাকায় একটি অপরাধ চক্র তৈরি করে জাতীয় নিরাপত্তা, জাতিগত পরিচয় ও আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতার ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। অনেকে বঙ্গোপসাগরে জেলে হিসেবে গিয়ে বাংলাদেশি জেলেদের হত্যা করছে। মাছ ধরার ট্রলার ছিনতাই করছে।

 

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা আগে স্থানীয়ভাবে অপরাধে জড়াতো। এখন কেউ কেউ তথাকথিত জঙ্গি সংগঠন আইএসেও যোগ দিচ্ছে। পুলিশের মহাপরির্দশক এ কে এম শহীদুল হক পুলিশ সুপারদের এ ব্যাপারে কঠোর ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

 

পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানের শেষদিনে তিনি পুলিশ সুপারদের এ নির্দেশনা দেন। অবশ্য কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন বলেছেন, আইএসে যোগ দিচ্ছে এমনটি নয়, আইজিপি স্যার আমাদের বলেছেন, রোহিঙ্গারা যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না পড়ে – সেদিকে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যেখানে আছে সেখানে আমাদের পুলিশের ক্যাম্প আছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সেখানে কাজ করছেন। তাদের সব কার্যক্রম মনিটরিং হয়। তারা সবসময় আমাদের নজরদারির মধ্যে থাকে।

তবে বাংলাদেশের শীর্ষ একটি ইংরেজি দৈনিকের খবর, পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেছেন, রোহিঙ্গারা আইএসে যোগ দিচ্ছে। এমনকি নব্য জেএমবি, হুজিসহ যত ধরনের জঙ্গি সংগঠন আছে, সেখানে যোগ দিচ্ছে তারা।

রোহিঙ্গাদের জঙ্গি তত্‍পরতা, ভোটার হওয়া, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো- এমন অনেক বিষয়ই নিয়েই কথা বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের কার্যক্রমের খোঁজ-খবর তিনি নিয়মিতই রাখেন।

তার মতে, প্রথমত, এখানে যারা আশ্রয়প্রার্থী ছিল, তাদের সবাইকে গণনার মধ্যে আনা হয়নি৷ প্রথম দিকে যারা এসেছিল, তারা নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত ছিল৷ আমাদের ভোটার লিষ্টে তারা ঢুকেছে৷ সেখান থেকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে৷সেখানে এদের বেশ কিছু সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হয়েছে৷ এখন কথা হলে, রোহিঙ্গারা যে ধরনের পরিস্থিতিতে আছে, সেখানে তাদের অপরাধে যুক্ত হওয়া সহজ।

 

তবে যত দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা সঙ্কট বেশ ঘনিভূত হয়ে উঠছে। এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো তত একটা জোরালো ভূমিকা পালন না করলেও মিয়ানমারের পক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত, চীন ও রাশিয়া। যদিও জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর আমানবিক নীপিড়ন বন্ধে আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু সেটিতেও সাড়া দিচ্ছে না শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি’র মিয়ানমার। তারা অবধারিতভাবে বাংলাদেশে পুশইন করেই চলেছে রোহিঙ্গাদের!

 

সাম্প্রতিক বিষয়গুলো বিবেচনা করলে এতটুকু বোঝা যাচ্ছে, চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ বেশ ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছে! হতে পারে বাংলাদেশকে সমস্যায় ফেলতে এটা উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক কৌশল। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গা একটা ইস্যুমাত্র; মূল টার্গেট বাংলাদেশ! আর এ শঙ্কাটা বাড়িয়েছে ভারত ও চীন। এ দু’টি দেশ মিয়ানমারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে এবং মিয়ানমারকে তারা সার্বিক সহযোগিতাও করে যাচ্ছে।

 

এদিকে ভারতের সাথে পাকিস্তানের শত্রুতা আবার চীনের সাথেও। এবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা শত্রুতা ভুলে মিত্রর বেশ ধারণ করে এক্যজোট হয়ে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়ানোটা বাংলাদেশের জন্য অশনি সঙ্কেত বলেই মনে হচ্ছে। তাদের এভাবে একজোট হওয়া মানেই বাংলাদেশের দিকে বিপদ ধেয়ে আসার সম্ভাবনাটা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করছে বা করবে, সেটি এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে তাদের সাম্প্রতিক আচরণে।

 

মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) রোহিঙ্গা ইস্যু সৃষ্টির নেপথ্যে। ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ৫ সেপ্টম্বর মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম মিজিমা তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ‘রাখাইন রাজ্যের চলমান সহিংসতার জন্য দেশটির সেনাবাহিনী দায়ী নয়। এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড দমননিপীড়নের পেছনে হাত রয়েছে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের।

মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম মিজিমা যে তথ্য দিচ্ছে এতে করে অনুমান করা যাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু নয়; বাংলাদেশকে টার্গেট করে এগিয়ে আসছে পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস! সব মিলিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই ঘোলাটে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মিয়ানমারের নিজস্ব অনেক সম্পদ রয়েছে। চীন তাদের পক্ষে জাতিসংঘে ভেটো দেয়। যার কারণে তারা আন্তর্জাতিকগোষ্ঠীর আহ্বানকে সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না। বিকল্প কোনো আঞ্চলিক ও সামরিক জোট ছাড়া মিয়ানমারকে বাগে আনা যাবে না।

 

রোহিঙ্গারোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ এক বা দুই বছর ধরে ঝামেলা পোহাচ্ছে না। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু। সেসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সময়ে এদেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেই সঙ্কট সমাধান হবে না। বরং আমাদের নিরাপত্তা সুরক্ষায় জন্য রোহিঙ্গাদের ঢল ঠেকাতে হবে। একইসাথে এখানে যারা আছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে তাদের ফিরিয়ে নিতে। খেয়াল রাখতে হবে রোহিঙ্গা জোনগোষ্ঠী কোনোভাবেই যেন এ দেশের মূল স্রোতে মিশে যেতে না পারে।

 

১৮৫৩ সালের আগ পর্যন্ত মান্দালয় ছিল মিয়ানমারের রাজধানী। মান্দালয়ের তখন নাম ছিল আভা। ব্রিটিশরা আভা থেকে রাজধানী ইয়াঙ্গুনে নিয়ে আসে। মান্দালয় মিয়ানমারের প্রাচীন একটি শহর। ১৭৮৪ সালে বর্মি রাজা ভোদাপায়া আরাকান দখলের পর তিন হাজার ৭০০ মুসলমান আরাকান থেকে নিয়ে এসে রাজধানী আভায় বসবাসের ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য ছিল আরাকানের আদলে বার্মার বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও মুদ্রাব্যবস্থা চালু করা। কারণ আরাকানের চেয়ে তখনো বার্মা অনেক পশ্চাৎপদ ছিল বিভিন্ন দিক দিয়ে। মান্দালয়ে অনেক শিক্ষিত, ধনী, ব্যবসায়ী মুসলমান বসবাস করছেন প্রাচীন কাল থেকে।

 

বাংলাদেশের কক্সবাজারে ছয় হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পাহাড়ে এখন রোহিঙ্গাদের বসতি৷ এটা বেড়ে আট হাজার একর হওয়ার আশঙ্কা করছে বনবিভাগ৷ আর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে পরিবেশ ও প্রাণীবৈচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে৷

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের’ সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বসবাস এবং পরিবেশের ওপর এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, পুরনো এবং নতুন রোহিঙ্গা আশ্রয় কেন্দ্র গড়েই উঠেছে সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে৷ এখানে পরিবেশকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি৷ এরই মধ্যে কক্সবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে৷ কক্সবাজার ও বান্দরবানে হতির সংখ্যা কমে যাচ্ছে৷ গাছপালা উজাড় হচ্ছে৷ সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হল পাহাড় ধস আরো বেড়ে যাবে৷”

বাংলা রিপোর্ট/এমআর