ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 months ago

নৃশংস হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ: কেন বৈশ্বিক চাপেও থামছে না মিয়ানমার?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

এখনো আগুন জ্বলছে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামগুলোতে। নৃশংস হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর। নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও থামছে না মিয়ানমার। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর বীভৎস হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে এ পর্যন্ত চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

 

সিএনএন গত বৃহস্পতিবার জানায়, রোহিঙ্গাদের বাস্তব অবস্থা দেখতে বৃহস্পতিবার মিয়ানমারে প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাখাইন রাজ্য সরকারের সচিব টিম মং সুয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গতকাল জানান, মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফিকে রাখাইনের সহিংসতাকবলিত এলাকাগুলোতে যেতে দেওয়া হবে না। তিনি শুধু ইয়াঙ্গুন গিয়ে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। রাখাইনের রাজধানী সিত্তে গিয়ে গভর্নরের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।

 

ওয়াশিংটনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং লিনকে বৃহস্পতিবার তলব করেন প্যাট্রিক মার্ফি। এ সময় অং লিনকে জানানো হয়, রাখাইনের গ্রামগুলোতে হামলাসহ সেখানকার সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ সময় প্যাট্রিক মার্ফি বলেন, মিয়ানমারের প্রকাশ্যে স্বীকার করা উচিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে নেবে।

 

রাখাইনের সহিংসতা নিয়ে অন্য দেশগুলোকে নাক গলানোর বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো মনে করে এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভার বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা স্পুটনিক শুক্রবার এ কথা জানায়।

 

জাখারোভা গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করা হলে তাতে করে আন্তধর্মীয় সংঘাতের আরও অবনতি হতে পারে। আমি জোর দিয়ে বলছি, মিয়ানমারে সব ধর্মের নেতাদের নিয়ে আন্তধর্মীয় সংলাপের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাই।’

 

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ তাদের বাড়িঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই সংকটে অন্য যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও একই রকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

 

রাখাইনে সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, জাতিগত নিধন ইত্যাদি অভিযোগ ক্রমশ জোরের সঙ্গেই বলছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ওআইসি ছাড়াও বিভিন্ন দেশ। এরপরও সহিংসতা বন্ধ করছে না মিয়ানমার। উল্টো জাতিগত নিধনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে।

রোহিঙ্গাদের নিধনে পোড়ামাটি নীতি: অ্যামনেস্টি

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের পর এবার লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রাখাইনে ‘জাতিগত নিধনের’ অভিযোগ এনেছে। সংগঠনটি বলছে, মিয়ানমার সুপরিকল্পিতভাবে এই অভিযান চালাচ্ছে। দেশটির সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

 

অ্যামনেস্টি বলছে, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের নিধনের জন্য ‘স্কর্চড আর্থ’ (পোড়ামাটি) কৌশল নিয়েছে মিয়ানমার। ২৫ আগস্টের পর থেকে অন্তত ৮০টি এলাকায় সুপরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে স্যাটেলাইট চিত্রে। অগ্নিসংযোগের তথ্য, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া ছবি, তোলা ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি নতুন তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে। এসব থেকে প্রমাণিত হয়, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের গ্রামকে লক্ষ্যবস্তু করে পরিকল্পিত অভিযান ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে।

 

অ্যামনেস্টির ক্রাইসিস রেসপন্স ডিরেক্টর তিরানা হাসান বলেন, এসব তথ্যপ্রমাণ অকাট্য। রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে তাড়াতেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে অভিযান চালাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি জাতিগত নির্মূল অভিযান।

 

অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা নির্মূলে স্কর্চড আর্থ কৌশল গ্রহণ করেছে। এই কৌশলের মাধ্যমে গ্রামকে ঘিরে রাখে, পালানোর সময় মানুষকে গুলি করে, তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় এসবই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। গত চার বছরে এত প্রকটভাবে অগ্নিসংযোগের ঘটনা আর ঘটেনি।

 

স্কর্চড আর্থ এমন একটি সামরিক কৌশল, যাতে সেনারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময় ‘শত্রু’ সেনাদের হত্যার পাশাপাশি সবকিছু পুড়িয়ে দেয়। শত্রুর পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব এমন স্থাপনা ও অবকাঠামো পুড়িয়ে দেয়।

 

এ থেকে পরিত্রাণ পায় না খাদ্যের উৎস, পানি সরবরাহ, পরিবহন, যোগাযোগ, শিল্পকারখানা। সামরিক কৌশল অনুযায়ী সেনাবাহিনী ‘শত্রু’ ভূমিতে অথবা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডেও ব্যবহার করতে পারে। শত্রুর সম্পদ ধ্বংস করার কৌশলের চেয়ে স্কর্চড আর্থ ভিন্ন। এই কৌশলটি একেবারেই কৌশলগত এবং রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা হয়।

 

কৌশলগত কারণে সংঘর্ষকবলিত এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের খাদ্যের উৎস ও পানির সরবরাহ ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী।

 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে এই কৌশল ব্যবহার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সাম্প্রতিক ইতিহাসে শ্রীলঙ্কা, লিবিয়া ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও কৌশলটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

 

রাখাইন অঞ্চলের নতুন স্যাটেলাইট ছবি, প্রত্যক্ষদর্শী, ছবি ও ভিডিওর বরাত দিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রদেশটির উত্তরাঞ্চলে অন্তত ৮০টি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

 

মিয়ানমার সরকার গত বুধবার দাবি করেছে, তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশনে রোহিঙ্গাদের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রামকে টার্গেট করে সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ১৭৭টি গ্রাম জনশূন্য এবং ৩৪টি আংশিকভাবে পরিত্যক্ত।

 

রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অ্যামনেস্টি জানায়, সেনা, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগীরা অনেক সময় চারদিক থেকে একটি গ্রাম ঘিরে রাখে। গ্রামে প্রবেশের আগে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তারা আকস্মিক প্রবেশ করে এবং চারদিকে গুলি ছুড়তে শুরু করে।

 

সেনা অভিযানে বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তি বলেন, ‘যখন সেনাবাহিনী আসে, তখন তারা ভয়-আতঙ্কের মুখে দৌড়াতে থাকা মানুষের দিকে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আমি দেখেছি সেনারা অনেক মানুষ ও দুই কিশোরকে গুলি করে হত্যা করতে। তারা আমাদের বাড়িঘর জ্বালাতে অস্ত্র ব্যবহার করছে।’

 

অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, বাংলাদেশের নাফ নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে নেওয়া ছবি পর্যালোচনা করে মিয়ানমারের ভেতরে বেশ কয়েকটি স্থানে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।

 

রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে সেনাবাহিনী: এইচআরডব্লিউ

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে আগুন লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

 

গতকাল এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, রোহিঙ্গাদের জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের বাড়িঘরে এভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়াটা এটাই প্রমাণ করে, সেনাবাহিনী রাখাইন থেকে এই সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে। সংগঠনটি স্যাটেলাইটে ধারণ করা রাখাইনের কিছু নতুন ছবি এবং সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেছে। সে অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাখাইনের ৬২টি গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

বাংলা রিপোর্ট ডকটম/এইচএম