ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 1 month ago

আন্তর্জাতিক মহল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি কিভাবে মূল্যায়ন করবে?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনা ও পুলিশ চৌকিতে হামলার পর সন্ত্রাসী দমনের নামে মিয়ানমার সরকার রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা শুরু করে। গুলি করে হত্যা করে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে। শিশুদের গলা কেটে হত্যা থেকে শুরু করে নারীদের ধর্ষণের মতো পৈশাচিক কর্মকাণ্ডও চালিয়ে যায় মিয়ানমার সরকারি বাহিনী। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। তারা আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে তাদের বাস্তুচ্যুত করে।

উপায়ান্তর না দেখে রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশের সীমান্তে এসে জড়ো হতে থাকে। কাঁদাযুক্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা টেকনাফ সীমান্তে জড়ো হতে থাকে। প্রথমদিনে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করে তাদের পুশব্যাক করে।  সীমান্তে বিজিবি সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে বাংলাদেশ সরকার।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের অবর্ণনীয় দুর্দশায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে থাকে। প্রথমে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজার সফর করেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আহ্বান জানান।

এর মধ্যে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় কক্সবাজার বর্ডার খুলে দেয়ার। যাতে করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বিনা বাধায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। সরকার বারবার বলে যাচ্ছিলেন এত রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার আমরা নিতে পারব না। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

এরপর তুরস্কের ফাস্ট লেডি বাংলাদেশ সফরে এসে কক্সবাজার আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি তাদের জন্য আনা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে জানান রোহিঙ্গাদের সহায়তায় তুরস্ক সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউসহ সবকটি মুসলিম দেশ মিয়ানমারের গণহত্যার নিন্দা জানায়। সেইসাথে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে।

যেখানে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা দিচ্ছিলেন, সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মানবিকতাকে সবার আগে স্থান দিয়ে নানা জাতীয় সীমাবদ্ধতা, সংকট থাকার পরও লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। কয়েক হাজার একর জায়গার উপর অস্থায়ী ঘর বানিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের বর্বর সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন।

ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অনেক রাষ্ট্রের অবস্থানে কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে। জাতিসংঘ নড়েচড়ে বসার লক্ষণ দেখাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি এই দুঃসময়ে ছুটে গেছেন ওআইসি সম্মেলনে। সেখানে রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলায় মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

দেরিতে হলেও রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার ছুটে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা। তিনি বলেন, ‘মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। ঘর পোড়ানোর যন্ত্রণা অনুধাবন করতে পারি বলেই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। যতটুকু পারি আশ্রিতদের সহযোগিতা দেব। তবে বিশ্ববাসীকেও আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে এ ব্যাপারে জনমত গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে এসে শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের মুখে বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়ে বলেছিলেন, গুটিকয়েক সন্ত্রাসী দমনে মিয়ানমার সরকারকে সহযোগিতা করতে চান।

অপরদিকে ভারতেও আশ্রয় নিয়েছে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী।  ভারত কোনো অবস্থাতেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে না। এদের অবশ্যই মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হবে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। এ সঙ্কট মোকাবেলায় ভারত বাংলাদেশের পাশে আছে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টেলিফোন আসে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব নজরুল ইসলাম।

মিয়ানমার যেন তাদের শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়, সেজন্য ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চাপ দিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন সুষমা স্বরাজ।

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের জন্য ৫৩ টন ত্রাণ সামগ্রী হস্তান্তর করে ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাও সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মিয়ানমার সফরে গেলেও রোহিঙ্গা বিষয়ে কিছু বলেননি, যা নিয়ে আলোচনা ছিল। শরণার্থীদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে ভারত ও চীনের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর জন্যও বাংলাদেশের অনেকে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন।

কথিত এক সন্ত্রাসী হামলার পর ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনা অভিযানে নিপীড়নের শিকার হয়ে তিন সপ্তাহে সাড়ে চার লাখের মতো মুসলিম রোহিঙ্গা এরই মধ্যে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে এসেছে।

নতুন ও পুরনো মিলিয়ে আট লাখ শরণার্থীকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে তাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দসহ জাতিসংঘ, ইইউ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রশংসার জোয়ারে ভাসছে বাংলাদেশ। অনেকে এই ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নোবেল পাওয়ারও দাবি জানাচ্ছেন।

প্রথমে মিয়ানমার শরণার্থীদের বাংলাদেশে ঢুকতে না দিলেও পরে মানবিক কারণ বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়  সরকার। রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি কিভাবে মূল্যায়ন করবে আন্তর্জাতিক মহল সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে