ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 1 month ago

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন কতটুকু শক্তিশালী?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক

 

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট। তবে নির্বাচন কমিশন কতটা শক্তিশালী তা নিয়ে রাজনীতির মাঠে রাজনীতিকরা জল কম ঘোলা করেননি। আজিজ ও রকিব মার্কা নির্বাচন কমিশন নিয়ে উত্তাপ কম ছড়ায়নি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়েও উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিএনপি।তবে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন আসলে কতটুকু শক্তিশালী তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

 

 

নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হল নির্বাচন পরিচালনা, নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, আইন কর্তৃক নির্ধারিত অন্যান্য নির্বাচন পরিচালনা এবং আনুষঙ্গিক কার্যাদির সুষ্ঠু সম্পাদন। দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকবে এটা সবারই কাম্য।

একটা শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আসলে নির্ভর করে প্রধান নির্বাচন কমিশন ও তার নেতৃত্বাধীন অন্যান্য সদস্যদের ওপর।বিচারপতি আব্দুর রউফের নেতৃত্বে ১৯৯১ এর নির্বাচন, ১৯৯৬-এ বিচারপতি মোহাম্মদ আবু হেনার নির্বাচন
কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে সুষ্ঠু নির্বাচন বলা চলে।

 

 

আবু হেনা সরে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন ২০০১ সালের মে মাসে নতুন সিইসি হিসেবে সাবেক আমলা এম এ সাঈদকে নিয়োগ দেন। তার অধীনেই ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন হয়। এরপর সর্বশেষ এটিএম শামসুল হুদার
নেতৃত্বে নির্বাচন হয়।

অন্যদিকে বিচারপতি এমএ আজিজ এবং কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সময়ে আইনের সঠিক প্রয়োগ হয়নি। এখানে আইনের ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যোগ্য ব্যক্তিত্বের অভাবে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আইন থাকার পরও ব্যবহার করতে পারছে না। আইন থাকা আসলে মুল বিষয় না, নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ এবং নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারছে তা গুরুত্তপূর্ণ।

 

 

২০১০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সময় থেকেই ক্ষমতাসীন দল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও সক্ষম করার কথা বলে আসছে। নদীতে অনেক জল গড়িয়েছে, কিন্তু কমিশনকে শক্তিশালী করার কোনো উদ্যোগ কারও পক্ষ থেকেই নেয়া হয়নি।

কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য চারটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রয়োজন কমিশনের কাজের বৈধতা প্রদানের এবং কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য একটি যথাযথ আইনিকাঠামো। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন যোগ্য, স্বাধীনচেতা ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ দান। তৃতীয়ত, প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দান। চতুর্থত, প্রয়োজন রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের সদাচরণ।

 

 

নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনপদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত’ রাখার অঙ্গীকার করা হলেও এর জন্য কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেন উল্টো পথেই হেঁটেছেন। বর্তমান সাংবিধানিক বিধান একটি সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে একটি অন্তর্নিহিত বাধা। সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে লেভেল প্লেয়িংফিল্ড নিশ্চিত করা দুরুহ হবে- এমন অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। আসলে আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী আইন আছে, পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই।

 

 

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। অতীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে সবগুলোতেই ক্ষমতাসীনরা জয়ী হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে দলীয়করণ আরও চরম আকার ধারণ করেছে। তাই বিরাজমান সাংবিধানিক কাঠামোই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পথে একটি অন্তর্নিহিত প্রতিবন্ধকতা। এ অবস্থায় সবচেয়ে স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সহজ হবে না।

 

এদিকে মানুষের ব্যাপক আগ্রহের মধ্যে গঠিত নতুন নির্বাচন কমিশন শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোচনায় এবং গণমাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতারা নতুন কমিশনকে নিয়ে বিতর্কে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন। এ বিতর্কের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অতীত কর্মজীবন সামনে এনে এরই মধ্যে বিতর্ক হচ্ছে। বিএনপির তরফ থেকে বলা হচ্ছে তার নিয়োগ ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়নি।

 

১৯৭৩ ব্যাচের কর্মকর্তা নুরুল হুদা চাকরিজীবনে ফরিদপুর ও কুমিল্লার ডিসি ছিলেন। বিএনপি আমলে ওএসডি ও যুগ্মসচিব পদে বাধ্যতামূলক অবসরে যান তিনি। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আদালতের রায় ভুতাপেক্ষভাবে কার্যকরের পর সচিব পদমর্যাদায় অবসরে যান। তবে চাকরিজীবনে নুরুল হুদা সচিব হিসেবে কোনো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেননি।

 

 

বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নুরুল হুদার নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ। যে ব্যক্তি আজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এসেছেন, এই মেসেজটা জাতির কাছে গিয়েছে বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে। দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা আছে এভাবে। এবং আমরা দেখেছি যে, এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটাওতো প্রশ্নবিদ্ধ। প্রেসিডেন্টের কাছে একটা লিস্ট যাওয়ার পরে এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত সরকার বলে দিল তাহলে যাচাই-বাছাই কখন করলো? এটা যে পূর্ব নির্ধারিত সেটাওতো প্রমাণ হয়ে গেছে।

 

তিনি বলেন, এ বিতর্কের তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। যে নামগুলো ছিল সেখানে বিতর্কের উর্ধ্বে তো অনেক লোক ছিল। আজকে এটা (নির্বাচন কমিশন) গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বিতর্কিত হয়েছে, সন্ধিহান হয়েছে জাতি। আজকে এ জায়গাটাতেই হয়েছে সমস্যা।

অন্যদিকে নবগঠিত নির্বাচন কমিশনকে স্বাগত জানিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি গঠিত কমিশনকে যোগ্য মনে করছে এবং অনেকে বিএনপির তোলা নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের পাল্টা জবাব দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, নতুন কমিশনই আগামী নির্বাচন পরিচালনা করবে।

 

তিনি বলেন, অহেতুক একটা ভালো লোককে, একজন সম্মানিত মানুষকে অপমানিত করাটা হল বিএনপির মজ্জাগত অভ্যাস। বর্তমান কমিশনই আগামী নির্বাচন পরিচালনা করবে এবং এ সরকার অন্তবর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এর বাইরে বিকল্প কোনো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

 

নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে শুরুতেই এমন বিতর্ক আর পাল্টাপাল্টি অবস্থান সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করেছে। নতুন কমিশন নিয়োগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থানে বিরক্তি এবং সন্দেহ প্রকাশ করছে সাধারণ মানুষ।

 

বাংলা রিপোর্ট/এফএম