ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 months ago

নো-ম্যান্স ল্যান্ডে বসে কাঁদছে হাজার হাজার অসহায় মানুষ



কক্সবাজার (দক্ষিণ) প্রতিনিধি:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সীমান্তরক্ষী পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র রোহিঙ্গাদের সংঘর্ষের ঘটনায় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়টির নিরীহ মানুষদের ওপর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়ন তীব্রতর হয়েছে। জাতিসংঘের কফি আনান কমিটির রিপোর্টের পরই রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

গত পাঁচ দিনে আটশ’ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন অধিকার কর্মীরা। নিহতের মধ্যে অনেক নারী ও শিশুও রয়েছে। অভিযানের নামে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে।

সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকে অভিযোগ করেছেন, রাখাইনে তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। তারা তাদের ঘরবাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা তাদের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়ার যে অভিযোগ করছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবিতে এর মিল পাওয়া গেছে।

এসব ছবি থেকে রাখাইনের অন্তত দশটি জায়গায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলে মঙ্গলবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায় এইচআরডব্লিউ।

বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, যেসব জায়গায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে তা একশ’ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত। যা গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যেসব জায়গায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অগ্নিসংযোগ করেছিল তার চেয়েও পাঁচগুণ বড়। ওই সময় স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এক হাজার পাঁচশ ভবন আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার তথ্য বের করেছিল এইচআরডব্লিউ।

 

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীসহ উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ও রাখাইন সম্প্রদায় কর্তৃক আরকানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর বর্বর নির্যাতন সেই ১৯৭৮ সাল থেকে। আরকানে বসবাসরত মুসলিমদেরকে হত্যা, ধর্ষণ, গুম, বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে আসছে সেই থেকে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে মিয়ানমারের বর্বর বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর অমানবিক মানবতাবিরোধী কাজ করে আসছে।

তাদের বর্বরতা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলো রোহিঙ্গা মুসলমানরা। আরকানে মুসলমান হয়ে জন্ম নিলে এই রকম নির্যাতন সহ্য করতে হয়! এটা তাদের নিয়তি। এরপরও অতি কষ্টে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করে, মাতৃভূমি আঁকড়ে ধরে প্রাঁণপন বাচাঁর চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু সময়ে অসময়ে তাদের উপর নির্মম নির্যাতন অসহ্য হয়ে উঠলে, প্রাণ বাঁচাতে সহায় সম্বল ফেলে মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে এইসব রোহিঙ্গারা। কিন্তু এবারে উগ্রপন্থা দমনের অজুহাতে বোমা মেরে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য দাবি করে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার তরুণদের।

মিয়ানমার সরকারের সেনারা ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যজুড়ে। তারা গ্রামের পর গ্রাম আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে শত শত রাউন্ড মর্টার ও গুলি বর্ষণ করছে। নিহতদের শোকে বাকরুদ্ধ আত্মীয়স্বজন। চারদিকে কান্নার শব্দ। স্বজনের লাশ পেছনে ফেলে রুদ্ধশ্বাসে পালাচ্ছে মানুষ। আবার পালাতে চেষ্টা করা হলে পেছন থেকে করা হচ্ছে গুলি। যারা গোলাগুলির শিকার হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

ফলে গত বৃহস্পতিবার থেকেই অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আরো হিংস্র হয়ে উঠেছে। খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগসহ সবকিছুরর মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দিনে রাতে হেলিকপ্টার থেকে মর্টার, বোমা হামলা ও মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ শব্দে মূর্চ্ছা যাচ্ছে রোহিঙ্গা নারী ও শিশু। যেন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরকানে। উগ্রপন্থা দমনের অজুহাতে বোমা ও মর্টার হামলা করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য দাবি করে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার তরুণদের। প্রতিনিয়ত আরাকানের আকাশে উড়ে আসা হেলিকপ্টার থেকে মর্টারসেল নিক্ষেপ করছে। শোনা যায় মুহুর্মুহু গুলির শব্দ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ও শিশুর কান্নার আওয়াজ। গত বৃহস্পতিকবার থেকে দিন রাত থেমে থেমে গুলির আওয়াজ ও ওপারের অনেক এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী আতঙ্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আর বাংলাদেশ জিরোর পয়েন্টে বাড়ছে রোহিঙ্গা আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা।

রোহিঙ্গারা বলছেন, যুদ্ধ নয় গণহত্যার নতুন অধ্যায় শুরু করেছে সে দেশের সরকারি বাহিনী। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ও রাখাইন সম্প্রদায়। এইসব বাহিনী এবারে একচেটিয়া রোহিঙ্গাদেরকে গণহত্যা করে রাখাইন রাজ্যের পুর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছে। হাজার বছরের রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাসকে ধুলোয় মুছে দিতে গণহত্যার মত মানবতাবিরোধী কাজ করছে জাতিসংঘের আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে।

ফলে মিয়ানমারের সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর হাত থেকে নির্মম নির্যাতনে বাদ পড়ছে না মায়ের কোলের শিশু। মায়ের কোল থেকে শিশু ছুড়ে ফেলছে জ্বলন্ত আগুনে। পদদলিত করে দুই দিনের শিশু খুন করতে কুণ্ঠাবোধ করছেনা তারা। নারী ধর্ষণ করছে গণহারে। এইসব রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দিন দিন পুরিয়ে আসছে। নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, নারীধর্ষণ, লুন্ঠনের স্বীকার হয়ে জীবন বাঁচাতে সহায় সম্পত্তি ফেলে মাথা গুজার ঠাই খুঁজছে সহায়হীন অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ সীমান্তের নাফ নদীর পাড়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু জড়ো হয়েছে প্রাণ বাচাঁতে। আকাশের নিচে মাটির বিছানায় অন্য বস্ত্রহীন নিরুপায় হয়ে চেয়ে আছে একটু সহায়তা পাওয়ার আশায়। কোন মা সন্তান হারিয়ে, কোন সন্তান মা হারিয়ে ….. নয়নে আর্তনাদ করছে। মায়ের বুকে দুধ না পেয়ে ….লের শিশু ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে মাকে বলার চেষ্টা করছে। মায়েরা অসহায় হয়ে পড়েছে। অসহায় হয়ে পড়েছে এইসব নারীদের মাতৃত্ব। বয়োবৃদ্ধদের চোখে মুখে চরম হতাশার চিত্র। তাদের ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের চিন্তায় গাল বেয়ে চোখের অশ্রু ঝড়ছে। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। একটু আশ্রয় কি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের দেবে না? উভয় সঙ্কটে পড়েছেন। নিজ দেশে মিয়ানমারের বাহিনীর নিপীড়ন ও সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বিজিবির বাধা। জিরো পয়েন্টে খোলা আকাশের নিচেই তাদের আশ্রয়স্থল।

সহায় সম্বল হারা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহারে তরুণদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের ধরতে পারছে না তাদের গুলি করা হচ্ছে। বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে সব পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়ার উত্তরপাড়ার আহমদ হোসেন মুঠোফোনে জানান, রোববার খুব ভোরে সেনাবাহিনীর একটি দল গ্রামে ঢুকে স্থানীয় জহির, করিম ও আব্দুর শুক্কুরকে আটক করে নিয়ে যায়। এ সময় তারা পালিয়ে পাশের পাহাড়ে আশ্রয় নেন। পরে ওই তিন তরুণের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়।

ঢেঁকিবনিয়া পূর্বপাড়ার আবছার কামাল জানান, সেনাবাহিনী সন্ধ্যার পর বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি শুরু করেছে। যেসব বাড়িতে মানুষ পাচ্ছে না সেসব বাড়ি বোমা মেরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। যাকে পাচ্ছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে রাথদং জেলার সোহাগপ্রাং রোহিঙ্গা পল্লীতে নারকীয় হত্যালীলা চালিয়েছে মিয়ানমারের বর্বর বাহিনী । পুলিশ, লুন্টিং, সেনা ও বিজিপি সম্মিলিতভাবে এ বর্বরতা চালিয়েছে । গতকাল সোমবার দিবাগত রাতের শেষভাগে এ নৃশংসতা চালিয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে । কয়েক শত সৈন্য গ্রামটি ঘেরাও করে চিরুণী অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গা পুরুষদের আটক করে। আটককৃত পুরুষদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে গত হত্যা চালায়। রোহিঙ্গা নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে গ্রামের একটি স্কুলঘরে গণধর্ষণ করেছে। উঠতি বয়সের কন্যা শিশুও রক্ষা পায়নি সেনাদের ধর্ষণ থেকে। অনেকেই ধর্ষণে বাধা দেয়ায় তাদেরকে হত্যা করা হয়।

সূত্র আরো জানিয়েছে, হত্যার পর গাড়িতে তোলে অনেক লাশ নিয়ে গেছে। তবে বেশ কিছু মৃতদেহ এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এই সময় এই সব রোহিঙ্গা পল্লীতে অগ্নিসংযোগ করে । পুড়ে মরেছে গবাদিপশুও। গ্রামটি এখন জনশূন্য ও নিস্তব্ধ। এরপর আশেপাশের সব রোহিঙ্গা পল্লী ঘিরে রেখেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ইতিমধ্যে আরাকানের প্রত্যেক মুসলিম পল্লীতে নিধনযজ্ঞ চালানোর জন্য ইতিমধ্যে অমুসলিমদের সরিয়ে নিয়েছে প্রশাসন। এভাবে বর্ববরতা চলতে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো আরাকান রোহিঙ্গা শূন্য হতে পারে বলে আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি অতিরিক্ত ১৫ হাজার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার টেকনাফের নাফনদীর জলসীমানা অতিক্রম করার সময় ৪৭৫ জন রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি’র) সদস্যরা। রাতে নাফনদীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। ফেরত পাঠানো এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশিরভাগ নারী, শিশু ও বৃদ্ধ।

টেকনাফস্থ বিজিবি ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সোমবার রাতে পৃথক অভিযানে ৪৭৫ জন রোহিঙ্গাকে জলসীমানা অতিক্রম করার সময় প্রতিহত করে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়। গত ৫ দিনে ১০১৬ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে