ব্রেকিং নিউজঃ

বাংলাদেশের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট দল ঘোষণা  ***  রাস্তার ধারে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! প্রাণ হারালেন ৪ সেনা, আহত ৬  ***  ঢাবি ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত  ***  রোহিঙ্গা নির্যাতন, গণহত্যায় আন্তর্জাতিক গণআদালতে দোষী সাব্যস্ত হলেন সু চি ও সেনাপ্রধান  ***  দেশে ফোর-জি নেটওয়ার্ক সার্ভিস চালু হবে আগামী ডিসেম্বরে : তারানা হালিম  ***  বার্মায় রেডক্রসের ত্রাণবাহী নৌকায় বৌদ্ধদের হামলা  ***  ট্রাম্পকে কড়া ভাষায় জবাব দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট  ***  শ্যামপুরে আগুনে পুড়ে দগ্ধ একই পরিবারের ৫ জন, যেভাবে আগুন লাগে  ***  ভারতের কাছে ৫০ রানে হেরে গেল অস্ট্রেলিয়া  ***  প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশ ২৮৫ রানে এগিয়ে
Published: 4 months ago

রমজানের আগেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধি : কোনো কাজে আসছে না সরকারি উদ্যোগ



পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে তার উল্টো। এবারও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রমজানকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই অস্থির হয়ে উঠছে ভোগ্যপণ্যের বাজার। পণ্যের দাম বাড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হবে- সরকারের এমন হুঁশিয়ারির মধ্যেই বেড়ে চলেছে রমজানের পণ্য হিসেবে পরিচিত দ্রব্যগুলোর দাম। সক্রিয় বাজার সিন্ডিকেট। ভোগ্যপণ্যের আমদানি, মজুদ পরিস্থিতি এবং বাজারমূল্য নিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন ব্যবসায়ীরা। ওই বৈঠকে দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ছোলা, পেঁয়াজ এবং রসুনের মতো ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে গেছে এসব পণ্যের দাম।

এদিকে নিত্যপণ্যের অবৈধ মজুদের সন্ধানে বাজারে নামছে গোয়েন্দা টিম। এই টিমে দেশের চারটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ছাড়াও থাকছেন র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্য। অবৈধ মজুদের সন্ধান পেলে মজুদকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। জানা গেছে, রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের মজুদ পরিস্থিতি দেখতে বর্তমানে বাজার পর্যবেক্ষণে থাকা দেশের চার গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে একাধিক টিম পণ্যের মজুদ, চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি দেখভাল করছে। বাজার যাচাইয়ে এ টিম পণ্যের দাম ও মান যাচাই করবে। ভাউচারের সঙ্গে কোনো ধরনের অসঙ্গতি দেখলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থাও নেবে ওই টিম। এজন্য ব্যবসায়ীদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৭ সাল থেকে ঢাকা শহরের বাজার তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৪টি মনিটরিং টিম রয়েছে। একজন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন করে কর্মকর্তা এবং পুলিশ ও র‌্যাবের সমন্বয়ে এ টিম গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ টিম নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। সূত্র জানায়, বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখা, পণ্যের অস্বাভাবিক মজুদ ঠেকানোসহ সরবরাহ ঠিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত ১৪টি মনিটরিং টিমকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সারা বছর বাজার মনিটরিংয়ের জন্য গঠিত কমিটিতে উপসচিব পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতিটি কমিটি ছয় মাস করে বাজারে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করে।

প্রতিটি কমিটিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ও ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের প্রতিনিধি থাকেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত এই ১৪টি মনিটরিং টিম সারাবছর কাজ করলেও রমজানে তাদের কাজের গতিকে আরও জোরদার করা হয়। অন্য সময় বাজার স্থিতিশীল থাকলেও রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই একটি মহল অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। তাই আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।

গত কয়েকদিনে বাজারে ছোলা ও ডালের দাম নতুন করে এক ধাপ বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া ছোলা গতকাল বাজারে ৯৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া মুগ ডালের দাম গত সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা বাড়ার পর বাজারে আরও পাঁচ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা দরে, ভারতীয় মুগ ডাল ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাসকলাই ১৩৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল পাঁচ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫ টাকা, ভারতীয় মসুর ডাল ৮০ টাকা ও খেশারির ডালও ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় দেশে সব ধরনের পণ্যের মজুদ সন্তোষজনক। দেশে কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রয়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় সব ধরনের পণ্যের মজুদ গড়ে তুলেছেন। বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকটের গুজব সৃষ্টি করে দাম বাড়াচ্ছেন। রমজানে প্রতি বছরের মতো এবারও একটি সিন্ডিকেট করা হয়েছে। এর ফলে রমজানের আগেই বাজার অস্থির হয়ে উঠছে।

যদিও এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ ধরনের কোনো সিন্ডিকেট দেখা যাচ্ছে  না, অতীতেও দেখা যায়নি।

বাজার স্থিতিশীল রাখতে সব ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে  বৈঠক করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ছোলা ও চিনির মূল্য নিয়ে পাইকারি বাজারে সম্প্রতি কারসাজি হওয়ায় রমজান উপলক্ষে বিশেষ সতর্কবার্তা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। রমজানে বিশেষ বাজার মনিটরিং কার্যক্রম চালাবে মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে দু’তিনটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও করা হয়েছে। চূড়ান্ত করণীয় নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সারাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিসিরা বাজার মনিটরিং ছাড়াও ব্যবসায়ীদের সচেতন করার পরামর্শ দেবেন। কেউ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেবেন।

এদিকে সরকারি নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজধানীর শ্যামবাজার, মৌলভীবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ানবাজারের বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারওয়ানবাজারের কিচেন মার্কেটের দোতলায় গড়ে তোলা হয়েছে ছোলা ও চিনির অবৈধ গুদাম। এছাড়া ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বড় ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্যের মজুদ বাড়িয়ে যাচ্ছেন।

বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে প্রায়ই ভোগ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে। চিনি, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ এবং রসুনের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানো হচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম এখন কম।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রমজানে দেশে ছোলার চাহিদা ৬৫-৭০ হাজার টন। এই মুহূর্তে দেশে মজুদ আছে প্রায় আড়াই লাখ টন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ১২ হাজার টন ছোলা আমদানি হয়। একইভাবে প্রতিমাসেই ছোলা আমদানি হচ্ছে। এ হিসেবে রোজায় ছোলার কোন সঙ্কট হওয়ার কথা নয়।

রমজানে বাজার দর স্থিতিশীল রাখতে প্রতি বছরই সরকার ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর আওতায় সারাদেশে খোলাবাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করে থাকে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত সোমবার থেকে খোলাবাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা টিসিবি। এর আওতায় এ বছর খোলাবাজারে চিনি ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি লিটার সয়াবিন ৮৫ টাকা, ছোলা কেজিপ্রতি ৭০ টাকা, মশুর ডাল ৮০ টাকা আর খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা দরে।

রোজা সামনে রেখে প্রতিবছর পেঁয়াজ, চিনি, ছোলা, ডাল, তেল ও খেজুর বিক্রি করে থাকে টিসিবি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও এসব পণ্য বিক্রি করছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থাটি।

গত বছরের মতো এবারও দুই হাজার ৮১১ জন পরিবেশক টিসিবির পণ্য বিক্রি করছেন। সারা দেশে ১৮৫টি খোলা ট্রাকে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৩টি, চট্টগ্রামে ১০টি এবং অন্য বিভাগীয় শহরে পাঁচটি করে ও অন্য জেলা শহরগুলোতে দুটি করে ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

একেকজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ৪ কেজি চিনি, তিন কেজি মসুর ডাল, ৫ লিটার সয়াবিন তেল, ৫ কেজি ছোলা ও ১ কেজি খেজুর কিনতে পারবেন।

কিন্তু সরকারের নেয়া এ উদ্যোগ গেল বছরগুলোতে রমজানের বাজার স্থিতিশীল রাখতে খুব একটা সুফল বয়ে আনেনি। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রমজান আসার আগেই ঠিকই বাড়িয়ে নিয়েছেন। এবারের মাহে রমজানে সরকার নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে