ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 5 months ago

টাঙ্গাইলে ধানের চিটায় স্বপ্ন ভঙ্গ চাষীদের



টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

টাঙ্গাইলে কৃষকেরা যে স্বপ্ন নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছিল, সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ধানে অস্বাভাবিক চিটা হওয়ায় কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে হতাশায় পরিণত হয়েছে। লাভের পরিবর্তে এখন কয়েকগুণ লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। জেলায় এবার ধানের আবাদ ভালো হলেও ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চাষীদের মতে, সবই ঠিক-ঠাক ছিল। কিন্তু কেন ধানে চিটা হল তা জানা নেই তাদের। কৃষি বিভাগের বক্তব্য, আবহাওয়া প্রতিকুলে থাকায় এমনটি হয়েছে।

টাঙ্গাইলে পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটার কাজ। কৃষকেরা পার করছেন ব্যস্ত সময়। পেছন ফিরে তাকানোর এতটুকু ফুসরত নেই তাদের। কিন্তু তাদের মুখে হাসি নেই বহু কষ্টের ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে। জেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ জাতের ধান। এ দুটি ধানেই চিটার আধিক্য দেখা গেছে।

জেলার কালিহাতী, মধুপুর, বাসাইলসহ বিভিন্ন উপজেলায় ধানে চিটা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত ১৩ মে  শনিবার সরেজমিনে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধানগাছের গোড়া, কাণ্ড সবই ঠিক আছে। শুধু ধানের শীষটা মরে শুকিয়ে গেছে। আবার কোথাও ধানের শীষ টাটকা দেখা গেলেও ধানে কোন দানা নেই; পুরো শীষটাই চিটা হয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেতের একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়।

উপজেলার পালিমা চকে গিয়ে কথা হয় কৃষক মিন্টু মিয়ার সাথে। তিনি ১৭ শতাংশের একটি বর্গা জমিতে বিআর-২৯ জাতের ধান চাষ করে ধান পেয়েছেন মাত্র তিন মণ। জমির মালিককে অর্ধেক দেয়ার পর তার ভাগে ধান টিকেছে মাত্র দেড়মণ। ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ দরে যার বর্তমান বাজার মূল্য এক হাজার ৫০ টাকা থেকে ৭৫ টাকা। অথচ তার খরচই হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।

তিনি জানান, গতবছর এই জমিতে ধান হয়েছিল নয় মণ, এবার তিন মণ। আক্ষেপ করে মিন্টু মিয়া বলেন, ‘জমিতে সার-পানি, যত্নের কোনো অভাব হয় নাই। ধানও খুব ভালো হইছিলো। শেষ দিকে আইসা ধানের শীষ মইরা সব চিটা হইয়া গেল। বুঝলাম না কেন এমন হইল।’ শুধু মিন্টু মিয়া নন। ওই এলাকার ওকুবালি, পিয়ার আলী, চান মিয়া ও তোফাজ্জল হোসেনসহ আরো অনেকেরই একই অবস্থা। কৃষি বিভাগের কাছ থেকে কোন প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাননি বলেও তারা অভিযোগ করেন।

ওকুবালি জানান, তিনি গত বছর ৬০ শতাংশ জমিতে ধান পেয়েছিলেন ৩৮ মণ। সমপরিমাণ জমিতে এবার পেয়েছেন ২৪ মণ। তিনি বলেন, ‘যেভাবে ধান হইছিলো, মনে করছিলাম কমপক্ষে ৪০ মণ ধান পাব। কিন্তু চিটা হওয়ায় লস হইয়া গেল। ধানের গোড়া ঠিকই আছে, শুধু আগায় মাইর খাইছে।’

আরেক চাষি পিয়ার আলী বলেন, ‘৩৫ শতাংশের একটি জমিতে গত বছর ধান পাইছিলাম ২০ মণ, এবার সেই জমিতে ধান পাইছি ১২ মণ। ধান সব চিটা হইয়া গেছে। শুনছি আবহাওয়ার কারণে নাকি এমন হইছে।’

কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘ভাই, ক্ষেতে গেলে মাথা ঠিক থাকে না। এত কষ্ট কইরা ধান বুনলাম, এহন দেহি সব চিটা। চিটা ধান কাটতেও মন চায় না।’

মধুপুর উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায় সেখানেও ধানের শোচনীয় অবস্থা। উপজেলার শোলাকুড়ি এলাকার কৃষক নায়েব আলী এবার পাঁচ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি ৫০ শতাংশ জমির ধান কেটেছেন। তিনি বলেন, ‘ভাই, ক্ষেতে গেলে চিক্কির (কান্না) আহে। ধান দেইখা ভালই লাগছিল। কিন্তু হাত দিয়া দেহি সব চিটা। গত বছর এই ৫০ শতাংশ জমিতে ধান পাইছিলাম ৩০ মণ, এবার সেখানে পাইছি মাত্র ১০ মণ। লস হইছে সীমার বাইরে।’

বাসাইল উপজেলা বর্ণী কিশোরী গ্রামের কৃষক তায়েব হোসেন বলেন, গতবছর ৫৬ শতাংশ জমিতে ধান পাইছিলাম ৩৩ মণ। সেখানে এবার পাইছি ২৫ মণ। অতিরিক্ত চিটা হওয়ার কারণেই এবার ধান কম হইছে বলে তিনি জানান।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় বোরোধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে। আর আবাদ করা হয় এক লাখ ৭৯ হাজার ৭৪৫ হেক্টওে। এ বছর ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লক্ষ্য ৪৩ হাজার ২০০ মেট্রিকটন। গত ১৫ মে পর্যন্ত জেলায় ধান কাটা হয়েছে ৪২ ভাগ।
ধানে অস্বাভাবিক চিটা হওয়ার বিষয়ে টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবু আদনান বলেন, ধান ভালো হওয়ার জন্য দিনে-রাতে সমান তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। অথচ টাঙ্গাইলে ওই সময় দিনে ছিল অতিরিক্ত গরম এবং রাতে ছিল অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। এছাড়া ধানে ফুল হওয়ার সময় অতিরিক্ত বাতাসের কারণে পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে আমাদের কোনো হাত ছিল না। মূলত এসব কারণেই ধানে চিটা হয়েছে। এতে উৎপাদন অবশ্যই কমবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে