ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 months ago

হাইকোর্টের রায়ে বিশ্বজিতের পরিবার সন্তুষ্ট নয় কেন?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা। প্রকাশ্যে কুপিয়েছিলেন সাত থেকে আটজন। তার শরীরে একের পর এক কোপের আঘাত লাগার ভিডিও এসেছে গণমাধ্যমে। এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া কোপানোর ছবি জলজ্যান্ত। তবে আজ সেই মামলার রায়ে ক্ষুব্ধ-বিস্মিত তার পরিবার।

৬ আগস্ট রোববার চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় রায় ঘোষণার পরপরই এক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজিতের ভাই উত্তম দাস বলেন, এটা কেমন রায় হলো! এমনটা তো আমরা চাইনি। এটা বিচার না খেলা? আগের আদালত আট জনকে ফাঁসি দিলো। আর এখন দিলো মাত্র দুই জনকে। তাহলে আগের বিচারক কী দেখে রায় দিলেন।

রাজধানীর পুরান ঢাকার দর্জিদোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় দু’জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে রোববার বিকেলে ঘোষিত রায়ে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আটজনের মধ্যে দু’জনের দণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন, চারজনকে খালাস এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেয়া হয়েছে।

নিম্ন আদালতের সঙ্গে উচ্চ আদালতের রায়ের পার্থক্য তুলে ধরে বিস্ময় প্রকাশ করে বিশ্বজিতের ভাই উত্তম দাস বলেন, দুই রায়ে এত পার্থক্য হয় কীভাবে! এখন দেখি চারজনকে খালাসও দেওয়া হয়েছে। তার মানে এই চারজন জড়িত ছিল না।

তিনি বলেন, উচ্চ আদালত রায় দিলেন, কী বলব। অনেকেই জানতে চেয়েছেন খুশি হয়েছি কি না? এটা কি খুশি হওয়ার মতো রায়? কী বলব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তো বিশ্বজিতের ভাই। সাধারণ জনগণকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করুন এ রায়ে তারা খুশি নাকি। আমি তো বলব আমি খুশি নই। আমার আরও চাই।

তিনি বলেন, এখানে তো লুকোচুরি করার কিছু নাই। সাক্ষী-প্রমাণ বানানো বা সাজানোও নয়। সব চোখের দেখা, বাস্তবের মতো। ভিডিও ফুটেজ আছে, ছবি আছে। তারপরও দুই রায়ে এত বেশ-কম।

বিচারিক প্রক্রিয়ার আরও ধাপ আছে-এমন তথ্য জানালে উত্তম দাস বলেন, আর ধাপ! এই বিচারের যদি এত ধাপ লাগে, তাহলে মানুষ অন্যায় করবে না কেন? আমার মনে হয় টাকা থাকলে সব ধাপ পার করা যায়। টাকা-পয়সা খরচ করতে পারলে মনে হয় আমরাও অনেকদূর যেতে পারতাম। আপিল করার মতো ক্ষমতা তাদের নেই জানিয়ে তিনি বিষয়টি সরকারের হাতে ছেড়ে দেন।

পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় দায়ের করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সঠিক ছিল না উল্লেখ করে আদালত বলেছেন, সেখানে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে ময়নাতদন্তের কোনো মিল নেই। আদালত এই মামলায় টিভি ফুটেজ, স্টিল ফটোগ্রাফ পেপার কাটিং-এর মতো জিনিসগুলোকে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

৬ আগস্ট রোববার বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকালে আদালত বলেন, নিঃসন্দেহে অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে। টিভি ফুটেজ, স্টিল ফটো, পেপার কাটিং ও সাক্ষ্য প্রমাণগুলো প্রত্যক্ষ সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যে রিকশাওয়ালা বিশ্বজিৎকে হাসপাতালে নিয়েছিলেন তার কথা উল্লেখ করে আদালত বলেন, হত্যার মুহূর্তে বিশ্বজিৎ ছিল ‘ডিফেন্সলেস আনপ্রোটেকটেড’ এবং তাকে দিনের আলোতে খুন করা হয়।

হত্যাদৃশ্যের ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের মিল না থাকায় সুরতহালের সঙ্গে সূত্রাপুর থানার সংশ্লিষ্ট এসআই জাহিদুর রহমানের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের আইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে ময়নাতদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্যসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত এবিষয়ে ফলোআপ করতে আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ দাস হত্যার পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এই ‘জালিয়াতি’র কারণেই ছয় আসামি মৃত্যুদণ্ডের সাজা থেকে বেঁচে গেছেন কি না, এ নিয়ে কথা উঠেছে।

বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস এবং বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর বেঞ্চ রবিবার এই মামলার রায় ঘোষণার সময় সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকারী সুত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক জাহিদুল হক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক মাকসুদ রহমানের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশও দিয়েছে। তাদের কোনো কোনো গাফিলতি ও পেশাগত আসাদাচরণ আছে কি না তা বের করতেই এই তদন্ত হবে।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সুরতহাল তৈরিকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করবে পুলিশের একজন ডিআইজি। আর চিকিৎসকের বিষয়ে তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যসচিব, ডেন্টাল কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে।

এই তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে আদালতকে অবহিত করতে নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে একটি কাটা ও দুটি জখম এবং ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একটি জখম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্বজিৎ দাসের সুরতহাল প্রতিবেদনে সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক জাহিদুল হক লেখেন, ‘কোমরের ওপরে পিঠে হালকা ফোলা জখম দেখা যায়। ডান হাতের পাখনার (বগলের) নিচে আনুমানিক তিন ইঞ্চি কাটা রক্তাক্ত জখম ও বাম হাঁটুর নিচে ছেঁড়া জখম রয়েছে।’

আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক মাসদুল রহমান লিখেন, ‘পিঠে ডান কাঁধের (বগলের) নিচে সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া দেড় ইঞ্চি গভীর একটি ছুরিকাঘাতের জখম এবং বাম হাঁটুর জোড়ায় থেঁতলানো জখম রয়েছে। বগলের নিচে জখমের ফলে তাঁর শরীরের একটি বড় ধমনি কাটা গেছে। শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো স্বাভাবিক ও ফ্যাকাসে এবং হৃৎপিণ্ডের দুটি প্রকোষ্ঠই ছিল খালি। ডান কাঁধের নিচে (বগলে) ও বাম হাঁটুতে জখমের চিহ্ন।’

বিশ্বজিৎ হত্যা নিয়ে সূত্রাপুর থানার পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘আইনজীবীদের মিছিল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ছাত্রদের একটি মিছিল মুখোমুখি হলে সেখানে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। তখন বিশ্বজিৎ দৌড়ে যেতে থাকলে ২০-২৫ জন মিছিলকারী হাতে চাপাতি, রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করে ভিক্টোরিয়া পার্কসংলগ্ন উত্তর পাশের পেট্রলপাম্পের মোড়ে তাকে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। প্রাণে বাঁচতে বিশ্বজিৎ পাশের একটি মার্কেটের দোতলায় একটি দন্ত চিকিৎসালয়ের বারান্দায় যান। সেখানেও হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। বিশ্বজিৎ নিচে নেমে আসার পরেও তাকে আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করা হয়।’

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশ্বজিতকে হত্যার এক বছরের মধ্যে রায় হয় বিচারিক আদালতে। তখন আট ছাত্রলীগ কর্মীর ফাঁসি ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারক। আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায় হাইকোর্টে অনুমোদন করাতে হয়। একে বলে ডেথ রেফারেন্স। এই শুনানি ও আসামিদের আপিল শুনানি চলেছে একসঙ্গে।

আর এই শুনানি শেষে বরিবার হাইকোর্ট যে রায় ঘোষণা করেছে, তাতে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপাওয়া দুইজনকে খালাস এবং চারজনকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া দুইজনকেও খালাস দেয়া হয়েছে।

আসামিদের সাজা কমা নিয়ে বিশ্বজিতের পরিবার প্রশ্ন তুলেছে। একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। গণমাধ্যমকর্মীরাও আইনজীবীদের কাছে জানতে চেয়েছেন কোথায় ছিল গলদ।

এর মধ্যে হাইকোর্ট বেঞ্চের রায়ে এই মামলার তদন্তে অনিয়মের দিকটি সামনে উঠে আসে। তাহলে কি সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের কারণেই আট আসামি বেঁচে গেলেন?

জানতে চাইলে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজিবুর রহমান বলেন, ‘মিডিয়ায় যেভাবে কোপানোর দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তাতে তার শরীরে অনেকগুলো আঘাত থাকার কথা। সেই বিষয়টি না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।’

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এইচএম