ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

পাহাড়ে বিপর্যয় ঠেকাতে হার্ড লাইনে প্রশাসন



কক্সবাজার প্রতিনিধি:

সম্প্রতি ভয়াবহ পাহাড় ধসের পর নড়েচড়ে বসেছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন। জেলায় পাহাড়ধসে মৃত্যু ঠেকাতে হার্ড লাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের দ্রুত সরিয়ে নিতে একাধিকবার সভা করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। সভায় পাহাড়ে বসবাসরতদের সরানো ও পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়।

 

এ ছাড়া বসবাসকারীদের তালিকা তৈরি ও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার কথাও বলা হয় সভায়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা চিহ্নিতকরণ, পাহাড়কাটা বন্ধ ও পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদসহ এর স্থায়ী সমাধানের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্বারোপ করে কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্টরা। সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, ভারি বর্ষণের কারণে যেকোনো সময় পাহাড়ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের দ্রুত সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলোতে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

ইতোমধ্যে কমিটিগুলোর সহায়তায় পাহাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জেলা তথ্য অফিস মাইকিং করছে। সম্প্রতি মৌসুমী আবহাওয়ার করণে সারাদেশে ভারি বর্ষণ হওয়ায় পাহাড়ধসের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সম্ভাব্য পাহাড়ধসে মৃুত্যু এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা যেকোনো কিছুর বিনিময়ে অনাকাঙ্খিত মৃত্যু প্রতিরোধ করতে চাই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।

 

তিনি জানান, ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সতর্ক করতে ইতোমধ্যে আমরা মাইকিং শুরু করেছি। এছাড়া বৈঠক থেকে শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে একটি করে কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। এসব কমিটি ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের তালিকা তৈরি করে তাদের সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায়ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নিতে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র এবং নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 

এদিকে রাঙামাটি,  চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারে ১৫৪ জন ও বুধবার টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বাবা-মেয়ের নিহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন জেলা প্রশাসন। তাই পাহাড়ধসে অনাকাঙ্খিত মৃত্যু এড়াতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে ফেলতে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারে গত ৫ বছরে শতাধিক লোক মারা যান। তৎমধ্যে ২০১০ সালের ১৫ জুন ভয়াবহ পাহাড় ধসে সেনাবহিনীর ৬ জনসহ ৪৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৮ সালের ৪ ও ৬ জুন টেকনাফে একই পরিবারের ৪ জনসহ ১৩ জন নিহত হন। ২০১২ সালের ২৬ ও ২৭ জুন দুইদিনে জেলায় নিহত হয়েছেন ২৯ জন। ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই শহরতলির রাডার স্টেশন এলাকায় স্বামী-স্ত্রী, মা, ছেলে ও মেয়েসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন।

 

প্রতিবছর বর্ষা আসলেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি উচ্ছেদের জন্য দৌঁড়ঝাপ শুরু করে প্রশাসন। কিন্তু এর কোনো স্থায়ী সমাধান বের করা সম্ভব হয়নি। উল্টো পাহাড় কেটে বসতি বৃদ্ধি পেয়েছে উদ্বেগজনক হারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু কক্সবাজার শহরেই লক্ষাধিক লোক ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ করে বসবাস করছে।

 

এ অবস্থায় কক্সবাজারে পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা এসব বসবাসকারীদের দ্রুত সরিয়ে ফেলা না হলে আসন্ন বর্ষায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

এছাড়া টেকনাফ, কক্সবাজার শহর ও সদর এবং মহেশখালীতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে তাদের পরিচয়সহ তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব ওয়ার্ডে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকদের তালিকা প্রণয়ন এবং তাদেরকে পার্শ্ববর্তী আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটিও গঠন করা হয়। এসব কমিটির সদস্যরা যদি মনে করেন পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে থাকা বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে হবে, তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারিত আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

 

ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটির মধ্যে শহরের ৮নং ওয়ার্ডে সহকারী কমিশনার একেএম লুৎফর রহমানকে প্রধান করে ৬ জনের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এসব এলাকায় যারা ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করবে তাদের সরিয়ে কৃষ্ণানন্দ ধাম এবং বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমিতে আশ্রয় দেয়া সিদ্ধান্ত হয়। ৯নং ওয়ার্ডের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর তাহিমুল রহমানকে প্রধান করে ৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটিতে কাউন্সিলর হেলাল উদ্দিন কবিরকেও সদস্য করা হয়েছে। এ এলাকার বিবেকানন্দ স্কুলকে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সেখানেই আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ১০নং ওয়ার্ডে সহকারী কমিশনার (সদর) ভূমিকে প্রধান করে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে কাউন্সিলর জাবেদ মোহাম্মদ কায়সার নোবেলকেও সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। তারা উক্তস্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির একটি তালিাকা তৈরি করে পৌর প্রিপারেটরি স্কুলে আশ্রয় দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

 

১২নং ওয়ার্ডে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে কাউন্সিলর জিসান উদ্দিন জিসান এবং কহিনুর ইসলামকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। কমিটির সদস্যদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের লাইট হাউজ মাদরাসায় আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

৬নং ওয়ার্ডে সহকারী কমিশনার সংস্থাপন শাখার এহসান মুরাদকে প্রধান করা হয়েছে। এ এলাকায় সাহিত্যিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সিটি কলেজ আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ থাকবেন। এছাড়া ৭নং ওয়ার্ডে রেভিনিউ শাখার ডেপুটি কালেক্টর জুয়েল আহমেদকে প্রধান করে ৫ জনের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এবিসি ঘোনা প্রাথমিক বিদ্যালয় হবে আশ্রয় কেন্দ্র। সেখানেই ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আশ্রয় দিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব কমিটির পক্ষ থেকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে তাদের নাম জাতীয় পরিচয়পত্রসহ তালিকা প্রণয়ন করে জেলা প্রশাসক বরাবরে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে।

 

এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস স্থায়ীভাবে বন্ধের জন্য পাহাড় কাটা বন্ধ করা, বসতি স্থাপন বন্ধ করা, বর্তমানে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে জীবনযাপন স্বাভাবিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। বুধবার সভাশেষে কমিটির প্রধানগণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ঘোনার পাড়াসহ আশপাশ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

 

তিনি বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষের খাদ্য সরবরাহ করা হবে। সবাইকে নিজ উদ্যোগে নিরাপদে চলে যেতে নির্দেশনা দেন। কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান। এ সময় তার সঙ্গে কক্সবাজার পৌর মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুর রহমান চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। শহরের তারাবনিয়ারছরা এলাকার শাহজাহান জানান, যেভাবে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে বর্ষার আগে তাদের সরিয়ে নেয়া না হলে এ বছর মৃত্যুর মিছিল হতে পারে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারস্থ সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা সব সময় পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে থাকি। গত একমাসে ৫টি মামলা দায়ের করার পাশাপাশি মাটি কাটার ডাম্পার জব্দ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে শতভাগ পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন তিনি। কিন্তু সবকিছুর পরও পাহাড়ধসে মৃত্যু কমাতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন।

 

জেলা প্রশাসন থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়দের সচেতন করে পাহাড় কাটা বন্ধ করে সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হবে। কক্সবাজার পৌর মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, পাহাড়ধসে মৃত্যু কোনোভাবে কাম্য নয়। ঝুঁকিতে থাকা বসবাসকারীদের চিহ্নিত করে পুনর্বাসনের মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বুধবার থেকে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। আশা করি আসন্ন বর্ষার আগেই সবাইকে নিরাপদে নিয়ে আসতে পারব। তিনি বলেন, যদি কেউ সরতে না চায় তবে মৃত্যু ঝুঁকি এড়াতে বর্ষার আগে বসতি উচ্ছেদ করা হবে। এসময় ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এএইচ