ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

সীমান্ত দিয়ে আসছে ভারতীয় গরু, কোরবানির বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

দেশে চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে কোরবানির উপযোগী গরু, মহিষ ও ছাগল রয়েছে। যা দিয়ে কোরবানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এদিকে হঠাৎ করে ভারতীয় গরুর আমদানি বাড়ায় কোরবানির পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শংকিত খামারিরা।

ভারতীয় গরু আমদানির বাড়া-কমার ওপর বাংলাদেশের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। আমদানি বেশি হলে পশুর দাম কম থাকে। অপরদিকে ভারত থেকে গরু কম আসলে দাম থাকে চড়া। এছাড়া কোরবানির পশুর দাম বাড়া-কমার জন্য পরিবহন ব্যবস্থাও কম দায়ী নয়। সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো গাড়ি চলাচলের অনুপযোগী থাকায় সেই সাথে তীব্র যানজটের কারণে সময়মত কোরবানির পশু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেয়া করতে অনেক সময় নষ্ট হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কোরবানির পশুর দামও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

এছাড়া সারাদেশে যে পরিমাণ পশু কোরবানি করা হয় এর মধ্যে সিংহভাগই করা হয় রাজধানী ঢাকায়। গত কয়েক দশক ধরেই দেখা যাচ্ছে রাজধানীবাসীর অনেকে দাম বাড়ার আশংকায় কিছুটা বাড়তি দামে ২/৩ আগে কোরবানির পশু কিনে ফেলেন। পরে দেখা গেল ভারত থেকে ব্যাপক হারে গরু আসার কারণে ঈদের আগের দিন দাম অনেকটা পড়ে গেছে। এই চিত্রটা উল্টোও পরিলক্ষিত হতে দেখা গেছে। গরু ব্যবসায়ীরা ২/৩ আগে মোটামুটি কম দামে গরু বিক্রি করে ফেলেছেন। কিন্তু দেখা গেল বিভিন্ন জটিলতায় ভারত থেকে গরু আমদানি কম হওয়ায় ঈদের আগের দিন রাজধানীবাসীকে চড়াদামে কোরবানির পশু কিনতে হয়। গরুর সংকটের কারণে রাজধানীবাসীর অনেকেই ছাগল বা খাসি দিয়েই কোরবানি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে এক কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার। গত বছর কোরবানি উপলক্ষে সারাদেশে এক কোটি পাঁচ লাখ গবাদিপশু বিক্রি হয়। সে হিসেবে এবার চাহিদার তুলনায় গবাদিপশু বেশি রয়েছে। বর্তমানে দেশে কোরবানি উপযোগী গবাদি পশুর মধ্যে গরু ও মহিষ রয়েছে ৪৪ লাখ ৫৭ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া আছে ৭১ লাখ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আইনুল হক বলেন, দেশে যে পরিমাণ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আছে তা কোরবানির চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট। তিনি বলেন, সারা বছর প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর প্রায় ৫০ ভাগ জবাই হয় কোরবানির ঈদের সময়। সে হিসাবে কোরবানির সময় এক কোটি ১৫ লাখের মতো গবাদিপশু দরকার হবে। এ পরিমাণ গবাদিপশু দেশের খামারি ও গৃহস্থের ঘরে রয়েছে।

এদিকে ভারত থেকে গরু আসা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন খামারিরা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন সীমান্ত পথে প্রচুর ভারতীয় গরু আসছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাজশাহীর পবা, মতিহার, গোদাগাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের অহেদপুর ও রঘুনাথপুর সীমান্তে সরকার অনুমোদিত বিট/খাটাল দিয়ে ভারত থেকে প্রতিদিন গরু আসছে।

ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, গরু আমদানি তত বাড়বে বলে জানিয়েছেন গরু ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ভারতীয় গরু আমদানি ৪/৫ গুণ বেশি। তবে এখাতে বিটগুলোতে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

বিট/খাটালের নিয়ম অনুযায়ী সীমান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে ভারতীয় রাখালরা গরুর চালান বাংলাদেশি রাখালদের কাছে হস্তান্তর করে। পরে সেই গরুগুলো বিটে রাখা হয়। এরপর সরকারি শুল্ক বাবদ গরু প্রতি ৫শ টাকা ও বিট কর্তৃপক্ষকে ৫০ টাকা পরিশোধ করে গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। বিট/খাটাল চালু হওয়ায় অবৈধ পথে গরু আনার পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোটায় চলে আসে।

শিবগঞ্জ উপজেলার অহেদপুর ও রঘুনাথপুর বিট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে চার হাজার গরু আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে কোরবানির ঈদের আগে জুলাই ও আগস্ট মাসে একমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পথে ১২ হাজার ৭৯৮টি গরু এসেছিলো। অথচ এবছর শুধু জুলাই মাসেই গরু এসেছে ৬৮ হাজার ৫০১টি। যা গত বছরের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত চার লাখ ১৭ হাজার গরু এসেছে। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে গরু আসার পরিমাণ ততই বাড়ছে।

এর আগে ভারতের গরু সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাংসের দাম বেড়ে গেছে। দেশে বছরে মোট গরুর চাহিদার ৭০ শতাংশের যোগান দেয় দেশীয় খামারিরা। বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। এবার ভারত থেকে গরু না এলেও অন্যান্য দেশ থেকে গরু আসছে। ফলে বাজারগুলোতে কোরবানি ঈদ উপলক্ষে চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত গরু সরবরাহ থাকবে।

সীমান্ত এলাকার গরু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কোরবানি উপলক্ষে কয়েকদিন ধরেই ভারতসহ মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তান থেকে গরু আসছে। দিন দিন সীমান্ত এলাকায় অন্যান্য দেশের গরুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সীমান্ত এলাকায় আগের চেয়ে ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এতে করে কোরবানির পশুর হাতে গরুর দাম বাড়তি থাকার আশংকা করছেন ব্যবসায়ীরা।

প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছর ধরে ভারত থেকে গরু আসা কমেছে। এ অবস্থায় কোরবানির সময় পশুর চাহিদা মেটাতে দেশেই খামারিরা ব্যাপকভাবে পশু পালন শুরু করে। বর্তমানে দেশে ৫ লাখের মতো খামার গড়ে উঠেছে। এখন হঠাৎ করে প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় গরু আসলে লোকসান গুনতে হবে খামারিদের। অধিকাংশ খামারি ঋণ করে কোরবানির পশু লালন-পালন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. ইমরান হোসেন বলেন, দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু রয়েছে। তাই ভারত থেকে গরু আসলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। এতে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে আমরা স্বয়ংসম্পর্ণূতা অর্জন করব।

এদিকে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সব সময়ই ঘুষ বাণিজ্য হয়। আগে এক লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু আনতে ঘুষ দিতে হতো ২ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা। এখন সেই গরু আনতে ঘুষের হার পড়বে ১৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা। ঘুষ বেশি দিয়ে আনলে তো তার সামান্য প্রভাব হলেও বাজারে পড়বে।’

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে