ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 months ago

ভারতের গোরক্ষপুরে শিশু রক্ষা হলো না: কাটেনি অন্ধকারের কালো ছায়া ভারতে



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:
ভারতের উত্তরপ্রদেশে গোরক্ষপুরে সরকারি হাসপাতালে গত পাঁচদিনে ৬৫ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ভারতসহ সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়ে গেল। অক্সিজেনের অভাবে ভারতের মতো এত বড় একটি রাষ্ট্রে স্বল্পতম সময়ে এতগুলো শিশুর মৃত্যু সত্যিই বেদনাদায়ক। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, যাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, সেই আদিত্যনাথের রাজ্যেই কীনা এতগুলো শিশুর করুণ মৃত্যু! অনেকেই এই ঘটনাকে ‘গণহত্যা’র সাথেও তুলনা করেছেন।

কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্টে বলা হয়েছে- বস্তুত, গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে গোরক্ষপুর হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর ঘটনা। স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর, এতগুলো জমানা, এতগুলো প্রকল্প পেরিয়ে এই দৃশ্য দেখতে হবে এখনও? সরকারি হাসপাতালে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হবে একের পর এক শিশুর এবং স্বজন হারানোর হাহাকার ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রতিটি প্রান্তে? এবং অভিযোগ শুনতে হবে, বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ আসলে অক্সিজেনের অভাব? বিনা অক্সিজেনে মৃত্যু হয়ে গেল এত শিশুর?

এই দেশের শিশুদের কাছে স্বাধীনতার ৭০ বছরের অর্থ এটাই? গোরক্ষপুরের এক সরকারি হাসপাতালে ৩০ জনের বেশি শিশু মৃত্যুর পর এই অনিবার্য প্রশ্নটা তুলেছেন কৈলাশ সত্যার্থী। থেমে থাকেননি এখানেই। তাঁর মতে, গোরক্ষপুরে যা হয়েছে, তা গণহত্যা ছাড়া কিছু নয়।

যেমনটা হয়ে এসেছে এতগুলো বছর ধরে, তাই হচ্ছে আরও একবার। মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছেন, কড়া ব্যবস্থার আশ্বাস পাওয়া যাচ্ছে, মন্ত্রী-সান্ত্রীরা ছুটে আসছেন, ছুটে আসছেন বিরোধী নেতারাও, গোটা গোরক্ষপুর এখন মিডিয়ার নজরদারীতে। এর পরেও সেটাই হবে, যেটা হয়ে এসেছে এতগুলো বছর ধরে। মিডিয়ার দৃষ্টি সরে যাবে, মন্ত্রী-নেতারা সরে যাবেন, তদন্ত কমিটি তারিখের পর তারিখ পাবে, আবার অক্সিজেন কেলেঙ্কারি বা অন্য হাজারও দুর্নীতি শিকড়বাকড় ছড়াবে হাসপাতাল জুড়ে।

বদলাবে না শুধু নিকষ কালো অন্ধকারের রঙ, যে রঙটা চেপে বসে থাকবে গোরক্ষপুর অথবা এই ভারতের অন্য আর এক দুর্ভাগা এলাকার দাওয়ায় বসে থাকা কোনো এক মায়ের মনে। যে মা তাঁর কোলের শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ঈশ্বরের কাছে শুধু প্রার্থনা করেন, করে এসেছেন এতগুলো বছর ধরে, দেখো ঈশ্বর, এ যেন ফিরে আসে ঘরে, আগেরটার মতো না হয়।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, গত ১১ আগস্ট রাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রথম টেলিফোনটি আসে এনসেফেলাইটিস বিভাগের দায়িত্বে থাকা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাফিল আহমেদের কাছেই। সেই টেলিফোনে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়, খুব শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে অক্সিজেন সরবরাহ। তৈরি থাকুন।

সঙ্গে সঙ্গেই তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি। অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা কত বেশি শিশুকে কীভাবে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তাতে তিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। ঘুরতে শুরু করেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। ফোন করতে শুরু করেন অন্যান্য হাসপাতালে তাঁর ডাক্তার বন্ধুদের। প্রথমে যে হাসপাতালটিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা আহমেদকে দেয় তিনটি সিলিন্ডার। নিজের গাড়িতে চাপিয়ে সেই সিলিন্ডারগুলো তিনি নিয়ে আসেন বিআরডি হাসপাতালে। আবার বেরিয়ে পড়েন আরও সিলিন্ডার জোগাড় করার জন্য। গোটা রাত ঘোরেন রাস্তায় রাস্তায়। পরের দিন সকাল পর্যন্ত ঘোরেন এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে। পরের দিন, শুক্রবার সকালে যখন বিআরডি হাসপাতালে অক্সিজেন এক রকম নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন চিকিৎসক আহমেদ তাঁর জুনিয়রদের বলেছিলেন, অ্যাম্বু-ব্যাগ থেকে অক্সিজেন বের করে মরণোন্মুখ শিশুদের বাঁচাতে। তারই মধ্যে রাতভর হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে মোট ১২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করে ফেলেন তিনি।

 

এর পরেই অক্সিজেন সিলিন্ডারের এক স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে ফোন আসে চিকিৎসক আহমেদের কাছে। তাঁকে বলা হয়, নগদ টাকা হাতে পেলে হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেই টাকা মেটানোর জন্য আহমেদ তাঁর নিজের ডেবিট কার্ডটি সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেন তাঁর জুনিয়রকে। বলেন, ওই কার্ড দিয়ে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসতে। তার মধ্যেই অবশ্য অক্সিজেনের অভাবে শিশুগুলোর মৃত্যু হয়।

যিনি সে দিন অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করার জন্য পরের দিন সকাল পর্যন্ত ছোটাছুটি করেছিলেন, দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছিলেন এ হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালের, সিলিন্ডারের দাম মেটানোর জন্য নিজের ডেবিট কার্ডটা পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর জুনিয়রকে, গোরক্ষপুরের বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল (বিআরডি) কলেজের সেই চিকিৎসক কাফিল আহমেদকেই কীনা কোনো কারণ না দেখিয়েই তাঁর যাবতীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে