ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

গোরক্ষায় ইস্যুতে শুধু মুসলমানরা মার খাচ্ছে না, ভারতের অর্থনীতিও মার খাচ্ছে



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

 

ভারতে গরু নিয়ে যে তুলকালাম শুরু হয়েছে, তা দেশটির চামড়া শিল্পের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। ভারতে গরুর মাংস খাওয়া ও গরুর মাংস বহনের অভিযোগে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। হিন্দুধর্মে গরুকে দেবতা হিসেবে দেখা হয়। তাই ভারতের অনেক রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 

উগ্র গো-রক্ষকরা রাস্তাঘাটেও পাহারা দেন যাতে কেউ গরু এমনকি গরুর চামড়াও বহন করতে না পারে। কিন্তু গরু-মহিষ নির্বিশেষে চামড়া দেখলেই তাদের নির্বিচার হামলার কারণে এখন পরিবহন কোম্পানিগুলোও আর চামড়া বহন করতে চাচ্ছে না।

 

ফলে এর প্রভাব পড়ছে দেশটির বৃহৎ চামড়া শিল্পের ওপর। বিবিসি জানায়, বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, এখনও কিছু চামড়া ব্যবসায়ী ক্রেতাদের কাছে নিজেদের তৈরি পণ্য তুলে ধরছেন। যেমনটা করছেন চামড়া ব্যবসায়ী ইমরান আহমেদ খান। যদিও এ ধরনের ঘটনা এখন খুবই কম ঘটছে ভারতে। কারণ গরু নিয়ে ভারতে যে তুলকালাম চলছে, তার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশটির অন্যতম বড় এ শিল্প খাতে।

 

ফলে এখন ব্যবসা ভিয়েতনামে সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবছেন ইমরান। ইমরান আহমেদ খান বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আমাদেরও ছাঁটাই করতে হবে। কর্মীদের সংখ্যা কমাতে হবে। কারণ আমরা আর ব্যবসা চালাতে পারছি না। সরকারের যে নীতি, তা এই শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। তারা যেন এই শিল্পকে মৃত্যুসনদ দিয়ে দিয়েছে। যেখানে লাখ লাখ মানুষের রুটিরুজি রয়েছে।’

কলকাতার যেসব বড় চামড়া কারখানা রয়েছে সেখানে এখনও কাজ চললেও আগের তুলনায় মেশিনগুলো এখন খুবই কম ব্যবহৃত হয়। কারণ ভারতের অনেক রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর চামড়া নিয়ে যেসব ট্রাক এখানে আসছে, তার উপরেও ঘটছে হামলার ঘটনা।

 

কলকাতা ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা জিয়ে নাফিস বলেন ‘প্রতিদিনই সড়কে চামড়াবাহী গাড়ির ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। তাই গাড়ি মালিকরা আর চামড়া পরিবহন করতে চায় না। মানুষ বুঝতে চায় না এখানে কি গরু, নাকি মহিষ না কিসের চামড়া আছে। চামড়া দেখলেই তারা সেগুলো ছুড়ে ফেলে, গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়।

 

তারা মনে করে, সবই গরুর চামড়া।’ ফলে রুটি-রোজগার কমে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ চলছে। এদের বেশিরভাগই চামড়া কারখানার শ্রমিক বা কর্মচারী। একজন বিক্ষোভকারী নিরেজ কুমার জানান, তার মতো হাজার হাজার লোক তাদের চাকরি হারাচ্ছে।

 

নিরেজ কুমার বলেন, ‘আমরা এখন বেকার বসে আছি, কিছুই করার নেই। আমরা কিভাবে আমাদের পরিবারকে খাওয়াব। আমরা কি এখন চুরি করব।’ ভারতে এখন স্বাধীনতার ৭০ বছর পালন করা হচ্ছে। কিন্তু গরু নিয়ে বির্তক যেন সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। গরু এখন যেন ভারতের পথ নির্দেশক হয়ে উঠেছে। ভারতে একটি উদার দেশ নাকি হিন্দু দেশ, এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সন্দীপ রয় বলেন ‘আমি মনে করি, ভারতে গরু যেন অন্যদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়ের ভিন্নতার একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। কেউ যথেষ্ট দেশপ্রেমিক কিনা, সেটা যাচাইয়ে এটা যেন খুব সহজ একটি লিটমাস টেস্ট। সত্যিকারের ভারতীয় মানে বোঝানো হচ্ছে হিন্দু ভারতীয়।’ ভারতের অনেক ব্যস্ত সড়কে গরু এখন প্রধান আলোচনার বিষয়। তবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটির চরিত্র বদলে দেবে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 

অর্থ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে আর্থিক সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে, সুকৌশলে বলা হয়েছে, গবাদি পশু জবাইয়ে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা টানা হলে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষকরাই। এত দিন এই আশঙ্কার কথা বলছিল কৃষক সংগঠনগুলি। তাতে সায় দিচ্ছিলেন অর্থনীতিবিদরাও। এ বার খাস অর্থ মন্ত্রকের অন্দরমহল থেকেই সেই সতর্কবার্তা দেওয়া হল।

 

সমীক্ষার কোথাও সরাসরি গবাদি পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা বা গোরক্ষক বাহিনীর উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু বলা হয়েছে, কর্মক্ষমতা হারানোর পরে গবাদি পশুর দামের উপরেও পশুপালকদের রুটিরুজি নির্ভর করে। এমনিতেই কৃষি থেকে আয় পড়তির দিকে। কোনও ‘সামাজিক নীতি’-র জেরে পশুর মাংস বেচে আয় বন্ধ হলে এবং বুড়িয়ে যাওয়া গবাদি পশুকে বসিয়ে খাওয়াতে হলে, চাষি-পশুপালকদের আয় আরও কমবে। এই সব ‘সামাজিক নীতির’ ফলে সমাজে ক্ষতিই হবে।

 

আর্থিক সমীক্ষা তৈরি করেন অর্থ মন্ত্রকের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তা সংসদে পেশ করেছেন। মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই ‘সামাজিক নীতি’ কি গবাদি পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা? তাঁর জবাব, ‘‘এই সব প্রশ্ন করে আমাকে বিপদে ফেলবেন না।’’ কিন্তু আর্থিক সমীক্ষায় গো-জবাই রদ ঘিরে বিপদের কথা উল্লেখ করায় অনেকেরই বক্তব্য, সঙ্ঘ-পরিবারের উগ্রহিন্দুত্ব নিয়ে মোদী সরকারের মধ্যেই আপত্তি রয়েছে।

 

মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গোমাংস নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু। এক দিকে গোমাংস রাখার অভিযোগে একের পর এক পিটিয়ে খুন। অন্য দিকে গোমাংসে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা টানার চেষ্টা। অভিযোগ ওঠে, সরকার মানুষের খাদ্যাভাস নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু তাতেও না থেমে হাটেবাজারে কোনও গবাদি পশুই জবাইয়ের উদ্দেশ্যে কেনাবেচা করা যাবে না বলে নিয়ম জারি করেছিল কেন্দ্র। সুপ্রিম কোর্ট তার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তার আগেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল কৃষক, পশুপালক, মাংস রফতানি ও চর্ম শিল্পমহল থেকে। এ বার সরকারের অন্দরমহলেই আপত্তি উঠল।

‘সবারই গরুর গোশত খাওয়ার অধিকার রয়েছে’

গোরক্ষা ইস্যুতে একদিকে যখন ভারতের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চূড়ান্ত উত্তেজনা, তখন গরুর গোশত নিয়ে মন্তব্য করে শিরোনামে এলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালে। বললেন, ‘যার ইচ্ছা সেই গরুর গোশত খেতে পারে।’

 

সামাজিক ন্যয়বিচারমন্ত্রী রামদাস বলেন, প্রত্যেকেরই গরুর গোশত খাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে গোরক্ষকের নামে নর-ভক্ষক হওয়ার অধিকার নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

 

এ মন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকে কি খাবে না খাবে সেটা ঠিক করার অধিকার রয়েছে। কেউ যদি গরুর গোশত খেতে চায়, খেতেই পারে। আজকাল গোরক্ষকেরা গোরক্ষার নামে গোশত নিয়ে গেলেই গাড়ি থামিয়ে মারধর করছে। এর ফলে অনেক নিরপরাধ মানুষ মার খাচ্ছে। এই বিষয়টা তাই মোটেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।’

মোদি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য এইসব কাজকর্ম চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এর পিছনে বিরোধীদের মদত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

সিপিএমের কৃষক সভার নেতা হান্নান মোল্লার যুক্তি, ‘‘কৃষকদের আয়ের ৭০ ভাগ আসে জমি থেকে। বাকিটা পশুপালন থেকে। চাষের ক্ষতি সামলাতে না পেরে কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন। দুধ দেওয়া বা মাঠে হাল টানা বন্ধ করার গরু-মোষ পুষতে হলে তার খাইখরচ কোথা থেকে আসবে!’’ জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক বিকাশ রাওয়ালের বক্তব্য, ‘‘বছরে ৩.৭ কোটি পুরুষ গরু-মোষ জন্ম হয়। জবাই বন্ধ হলে এদের খাবারের পিছনে বছরে ৫.৪ লক্ষ কোটি টাকা খরচ।’’ রাওয়ালের প্রশ্ন, এই আর্থিক দায়ভার কি সরকার বইতে রাজি!

গো-রক্ষায় তাণ্ডব, প্রশ্ন এড়ালেন জেটলি:
গোরক্ষকদের তাণ্ডব ও দলিত-সংখ্যলঘুদের উপর হামলা নিয়ে সংসদে আলোচনায় রাজি হয়েছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। কিন্তু আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে বিরোধীদের প্রায় সব তির্যক প্রশ্নই এড়িয়ে গেলেন অরুণ জেটলি। ঘটনার নিন্দা করেই দায় ঝেড়ে ফেলেন রাজ্যসভার শাসক দলের নেতা। জেটলির বক্তব্য শেষ হতেই ক্ষুব্ধ বিএসপি সাংসদরা রাজ্যসভা ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

 

মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গোরক্ষকদের তাণ্ডব ও দলিত-সংখ্যালঘু নিগ্রহ বেড়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ এনেছেন বিরোধীরা। চাপের মুখে এ নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রস্তাবও মেনে নিয়েছে সরকার। গত কাল এই বিতর্কে সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদ। আজও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে চড়া সুরে আক্রমণ শানিয়ে কুমারী শৈলজার মন্তব্য, ‘‘দেশের নতুন নাম এখন লিঞ্চিংস্তান হয়েছে।’’ বিরোধীদের অভিযোগ, গোরক্ষকদের উৎপাত ও দলিত-সংখ্যালঘু নিগ্রহ মূলত বিজেপি-শাসিত রাজ্যেই বেশি হচ্ছে। শৈলজা বলেন, ‘‘শাসক দলের সমর্থন থাকায় আক্রমণকারীদের মনে কোনও ভয় নেই। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।’’

 

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির দাবি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গেও গোরক্ষকেরা সক্রিয়। সেই দাবি মানেননি তৃণমূল সাংসদরা। তাই কিছুটা ঘুরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে আক্রমণ শানায় বিজেপি। বিজেপির প্রভাত ঝা বলেন, ‘‘লোকসভা ভোটে রাজনৈতিক বিবাদে পশ্চিমবঙ্গে ৫০ জন মারা গিয়েছে। এটা কী পরিকল্পিত হত্যা নয়?’’ তাঁর মতে, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল দায় এড়াতে পারে না।’’

 

কংগ্রেসকে পাল্টা জবাব দিতে ১৯৮৪-র শিখ দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে আনেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর। বলেন, ‘‘শিখ দাঙ্গায় ৩০০০ জনের মৃত্যুর পিছনে যারা ছিল, তাদের অধিকাংশ শাস্তি পায়নি। তারা স্বাধীন ভাবে ঘুরছেন।’’ অস্বস্তিতে পড়ে কংগ্রেস প্রথমে হইচই ও পরে কক্ষত্যাগ করে। আবার বিজেপি-শাসিত ঝাড়খণ্ডে সংখ্যালঘু সমাজের লোকেদের কী ভাবে গো-হত্যার অভিযোগ তুলে হত্যা করা হচ্ছে, তা জানান জেডিইউ সাংসদ আলি আনওয়ার।

 

আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে এ ধরনের সমস্ত ঘটনার নিন্দা করেন জেটলি। বলেন, ‘‘হিংসা বরদাস্ত করা হবে না। যারা আইন নিজের হাতে নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ তিনি জানান, এই ঘটনাগুলিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বিচলিত। তাঁর নির্দেশে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ ওই রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন। কী ভাবে এই উৎপাত রোখা যায়, তার জন্য লিখিত পরামর্শও পাঠানো হয়েছে রাজ্যগুলিকে। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দেন জেটলি।

বাংলা রিপোর্ট ডকটম/এইচএম