ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 3 months ago

ফুঁসে উঠেছে বগুড়া



বগুড়ায় ছাত্রী ধর্ষণ ও মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে বগুড়া শহর। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে।

 

 

ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বগুড়ার মানুষ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শ্রমিক লীগ নেতা তুফান, নারী কাউন্সিলর এবং তাঁদের সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে মা-মেয়েকে নির্যাতন ও চুল কেটে দেওয়ার মামলার পলাতক পাঁচ আসামি তুফানের স্ত্রী আশা সরকার, কাউন্সিলর মার্জিয়া আক্তার ওরফে রুমকি, তাঁর মা রুমি বেগম, তুফানের দুই সহযোগী জিতু ও মুন্নাকে রোববার ঢাকার সাভার ও পাবনা শহর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 
বিক্ষোভকারীরা বলেন, খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা সবকিছুই ডালভাত তার কাছে। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের ছয়টি মামলার আসামি এই তুফান। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে ছয় বছরে গাড়ি, বাড়ি, ব্যবসা–প্রতিষ্ঠানসহ অঢেল সম্পদের মালিক এই তুফান। প্রশাসন আর নেতাদের হাতে রাখতে ঢেলেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। ক্ষমতা আর অর্থের একচ্ছত্র দাপটে এত দিন নানা অপকর্ম করলেও দলীয় নেতাদের আশীর্বাদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন তিনি।

 

 


একাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক বলেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতা হন তুফান। এরপর রিকশামালিকের ছবি দিয়ে মালিকের নেমপ্লেট তৈরি করে তুফান সরকার স্বাক্ষর দিয়ে অবৈধভাবে প্রায় ১০ হাজার রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করেন। শহর ছেয়ে যায় অবৈধ রিকশায়। নেমপ্লেট বাবদ ২০ হাজার টাকা এবং প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে তুফানবাহিনীর কর্মীরা। তার স্টিকার ছাড়া কোনো রিকশা সড়কে চলত না।

 

 

সাবেক প্যানেল মেয়র আমিনুল ফরিদ বলেন, তুফান সরকার ইয়াবা-ফেনসিডিলের ব্যবসা, খুন-ধর্ষণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। মাদক ব্যবসা ছাড়াও শহরে ব্যাটারিচালিত প্রায় ২০ হাজার অটোরিকশা ও ভ্যান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন। শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় আলিশান বাসা তার। শহরের চকযাদু ক্রস লেন সড়কে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কিছুদিন আগেও শহর শ্রমিক লীগের সহসভাপতি ছিলেন তুফান। নেতাদের আশীর্বাদে কিছুদিন আগে কমিটির আহ্বায়কের পদ পান তিনি।

 

 

বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, অটোরিকশা থেকে তুফান সরকারের চাঁদাবাজি ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। ছাত্রী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল বলেন, ছাত্রী ধর্ষণ ও নির্যাতনের দুটি মামলাসহ তুফান সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে পুলিশের নথিতে ছয়টি মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে র‌্যাব কয়েক শ বোতল ফেনসিডিলসহ তুফান সরকারকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ ছাড়া ২০১৩ সালে যুবদল নেতা ইমরান হত্যা মামলারও আসামি তিনি।

 

 


একাধিক সূত্র জানায়, বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর চামড়া গুদাম কসাইপট্টি এলাকার মজিবর রহমানের সাত ছেলের মধ্যে তুফান সরকার সবার ছোট। মজিবর রহমান প্রথমে রিকশা চালাতেন তারপর একসময় চামড়া কেনাবেচার ব্যবসা শুরু করেন। বাবার পৈতৃক ব্যবসার সূত্র ধরেই চামড়ার ব্যবসা করতেন তুফান। তার বড় ভাই আবদুল মতিন সরকার শহরের নেতা হওয়ার সুবাদে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার ও মাদক ব্যবসা শুরু করেন তিনি।

 
সূত্র জানায়, তুফান মাত্র দুই-তিন বছরে অবৈধ ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন। একাধিক প্রাইভেট গাড়িতে চলাফেরা করেন। অধিকাংশ সময় পরিবার নিয়ে ঢাকায় ফ্লাটে থাকেন। শহরের চকসুত্রাপুর চামড়া গুদাম এলাকায় অত্যাধুনিক পাঁচতলা ভবন নির্মাণ চলছে।

 
তুফান সরকার ২০১৫ সালে শহরের চকসুত্রাপুর এলাকায় বাণিজ্যমেলার নামে প্রায় দেড় বছর জুয়া পরিচালনা করেন। অভিযোগ রয়েছে সেখান থেকেই কয়েক কোটি টাকা আয় হয়। চোরাই গাড়ি কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 
শনিবার গ্রেপ্তার করা শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সামাদকে প্রধান করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।

 

 

ধর্ষণের শিকার মেয়েটি এখনো হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন মেয়েটি জানিয়েছে, শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। নড়াচড়া করতে পারছে না। মাথায় অনেক শখের চুল ছিল। চুলের কথা মনে হলেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান আবদুল মোত্তালেব হোসেন বলেন, মেয়েটির শরীরে লোহা বা রড-জাতীয় বস্তু দিয়ে সাত থেকে আট জায়গায় আঘাত করা হয়েছে। ফোলা ও জখম আছে।

 
১৭ জুলাই বাড়ি থেকে ক্যাডার দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে ঐ ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার। ঘটনা ধামাচাপা দিতে দলীয় ক্যাডার এবং এক নারী কাউন্সিলরকে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পেছনে লেলিয়ে দেন। শুক্রবার বিকেলে তাঁরা ওই কিশোরী ও তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালান। এরপর দুজনেরই মাথা নাপিত ডেকে ন্যাড়া করে দেন।
বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এএইচ