ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 3 months ago

বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন কেন?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক :
দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি প্রবল। এই ঘাটতি পূরণের জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে গেলে অনেক সময় নেবে। তাই বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করতে হবে। এসব কথা বলে সরকার ২০১০ সালে বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার এক অভূতপূর্ব  নিয়ম চালু করে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

 

এই আইন অনেক বেশি দুর্নীতির পথ তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি’ নয়, এটি কার্যত ‘দ্রুত লুণ্ঠন ও দুর্নীতি দায়মুক্তি আইন’ বলেও মন্তব্য করেন কেউ কেউ। ২০১০ সালে বিদ্যুৎ–সংকট নিরসনের অজুহাতে আইন প্রণয়নের সময়ই অনেকে মন্তব্য করেছিলেন- সংকটের টেকসই সমাধান তো দেবেই না, উল্টো সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্ম দিচ্ছে।

 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, অধিকাংশ রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে যেতে না পারলেও সরকার কিছুই করতে পারেনি।কারণ যারা চুক্তির পরও সময়মতো উৎপাদনে যেতে পারেনি, তাদের জরিমানা মওকুফের বিধানও এই আইনে রাখা হয়েছে।

 

আইনটির ক্ষমতা অসীম। কারণ জ্বালানি খাতে নেয়া সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত এই আইনের আওতায় পড়বে। প্রচলতি আইনের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও আদালতে মামলা চলবে না। অর্থাৎ ‘এই খাতে এখন কেউ দুর্নীতি করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে না। এই আইনের আওতায় বিদ্যুৎ ছাড়াও গ্যাস, কয়লা, পেট্রল, ডিজেলসহ যাবতীয় পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও নাবায়নযোগ্য জ্বালানিও অন্তর্ভুক্ত।

 

এ জন্য সরকার প্রণয়ন করে ‘স্পেশাল অ্যাক্ট ফর স্পিডি সাপ্লাই অব পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি ২০১০’। এই আইনের মাধ্যমে বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদনকে দায়মুক্তি দেয়া হয়।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যদিও সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলার কথা বলে এই আইন চালু করে, তবু বাস্তবে সেই দ্রুততায় আর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। বিনা টেন্ডারের অনেক প্রকল্প টেন্ডারের মাধ্যমে অনুমোদিত প্রকল্পের চেয়ে বেশি সময় নেয়।
বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই।

 

অনেকেই মনে করেন, টেন্ডার ছাড়া তথাকথিত দ্রুত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাওয়ার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। এরপরও সরকার এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া অব্যাহত রেখেছে।

 

২০১০ সালে দিল্লিতে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তা মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতীয় আগ্রাসনেরই নামান্তর। এই সমঝোতা অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশের রামপালে স্থাপন করবে ১৩২০ মেগাওয়াট শক্তিসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ চুক্তির বিষয়বস্তু দেশের সাধারণ মানুষ জানে না। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর মতে, ভারতের সরকারি বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপালে প্রথমে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছে।
পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো একটি ১৩২০ মেগাওয়াট শক্তিসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কথাও চুক্তিতে আছে। চুক্তির পরপরই সরকার এই প্রকল্পের জন্য ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করে। এর পরপরই এলাকার লোকজন তাদের কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলন শুরু করে। পরিবেশবাদীরাও জোরালোভাবে বলতে থাকে এই প্রকল্প সুন্দরবনের ওপর তথা প্রকল্প এলাকার চারপাশে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি করবে। তা একসময় সুন্দরবনের ধ্বংস ডেকে আনবে।

 

কিন্তু সরকার তা একদম কানে তুলছে না। ভারতের বন সংরক্ষণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে, সংরক্ষিত বনের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে বনের ক্ষতি হয় এমন কোনো স্থাপনা, বিশেষ করে বর্জ্য উৎপাদনকারী কোনো ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোই যাবে না। কিন্তু সেখানে ভারত সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে এই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করেছে সরকারিভাবে।

 

আসলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ে যেসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে সেগুলো ভারতের ধারাবাহিক আগ্রাসনেরই প্রক্রিয়া। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়া সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া পরিহার করে ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাতে শুধু ভারতীয় ঠিকাদারেরাই অংশ নিতে পারবে। স্পষ্টতই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে কাউকে কিছু না বলে ভারতের সাথে একতরফা সমঝোতা স্মারক সই করাটা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে ভারতীয় আধিপত্যের কাছে নতজানু হওয়ার ঘোষণা মাত্র।

 

ভারত যেকোনো মূল্যে প্রতিবেশী দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার জন্য নিজের নাক পর্যন্ত কাটতে নারাজ। নইলে ভারত যেখানে নিজেই বিদ্যুৎ ঘাটতির দেশ, সেখানে সে ঘাটতি রেখেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠাতে এতটা আগ্রহী কেন। ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ১ লাখ ৫০ হাজার মেগাওয়াট, অপর দিকে দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ২ লাখ মেগাওয়াট। প্রশ্ন হচ্ছে, নিজ দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ দিচ্ছে?

 

বিশেষজ্ঞদের মতে- ভারতের বর্তমান উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫১ শতাংশ উৎপাদন করা হয় কয়লা দিয়ে। সারা বিশ্বে ও ভারতে তাই পরিবেশবাদীরা ও নাগরিক সমাজের প্রগতিবাদী অংশ কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। প্রধানত যে চারটি দেশ আজ এই পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে, সেগুলো হল- যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও ভারত। আন্দোলনের তীব্রতায় এসব দেশ তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পটভূমিতে ভারতকে বর্তমান কয়লা দিয়ে উৎপাদিত ৭৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে দিতে হবে।

 

শুধু রামপাল নয়, দেশের যেকোনো স্থানে ক্ষতিকর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত। নিজেদের দিয়ে বাংলাদেশে যখন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, তখন তা করা হয় আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে। এভাবে সংগৃহীত মালামাল খুবই উচ্চমানের হয়। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিনা টেন্ডারে অনুমোদিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্পে বড় ধরনের একটি অংশ সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। একই ধরনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাড়তি স্থাপনা ব্যয়ের জন্য ভারতীয়দের স্থাপিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা। সেখানে বাংলাদেশে উৎপাদিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে মাত্র ৪ টাকা ৫০ পয়সা।

 

সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্পের অনুমতি না দিলেও সরকার মিথ্যাচার করে বলছে অনুমতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তো ভালো মানুষ, তারপরেও কার স্বার্থে মিথ্যা কথা বলছেন। সুন্দরবন ধ্বংসের যে পরিকল্পনা করছেন এটি কি দেশের জনগণের স্বার্থে নাকি অন্য কারও স্বার্থে?

 

প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক- ই-এলাহি চৌধুরী বীর বিক্রম সোমবার বিদ্যুৎ ভবনে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন ‘ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সুপারিশ অনুসারে ওই জায়গায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
ওই অঞ্চলে ‘কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা’ (এসইএ) সম্পন্ন হওয়ার আগে কোন ধরনের বৃহদাকার অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত হবে না বলে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ‘ইউনেস্কো- স্পষ্ট করেছে।

 

বিশ্ব ঐতিহ্য তথা সর্ববৃহৎ ‘ম্যানগ্রোভ বন’ সুন্দরবনের ব্যাপারে সরকার সচেতন রয়েছে উল্লেখ করে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, দ্রুত প্রশমনের পদক্ষেপ নেয়ার লক্ষ্যে আমরা প্রকল্পটি তথা পরিবেশ পর্যবেক্ষন করব। ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি’র ৪১তম সভায় পর্যবেক্ষক হিসেবে সরকার সাফল্যের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিসম্মত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

বাংলা রিপোর্ট/এফএম