ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 5 months ago

১০ টাকার ডাক্তার!



‘শহরের বড় ডাক্তাররা ফি নেয় ৫০০-৬০০ টাকা। আমার মতো মানুষের পক্ষে কি সম্ভব তাদের কাছে যাওয়া? আর সদর হাসপাতালে গেলে লাইন দিয়ে সিরিয়াল নিতে হয়। সারাদিন কেটে যায়। সেদিন আর রিকশা চালাতে পারি না। উপার্জনও বন্ধ থাকে। স্ত্রী-সন্তানের পেটে ভাত যায় না। এই ১০ টাকার ডাক্তার তাই আমাদের মতো লোকজনের জন্য আশীর্বাদ। তার কাছে যদি কোটি টাকার সেবা পাওয়া যায়, তা হলে কী দরকার বলেন ৫০০-৬০০ টাকা খরচ করার?’ অতএব, তার কাছেই আসেন সাতক্ষীরার ৫৮ বছরের রিকশাচালক শিবপদ দাস। আসেন আরও শত শত মানুষ। সাতক্ষীরার গণমানুষের ভরসার স্থল এই ‘১০ টাকার ডাক্তার’ মো. এবাদুল্লাহ। কয়েকদিন আগেও যিনি ছিলেন ‘পাঁচ টাকার ডাক্তার’। নানা বাস্তবতায় সম্প্রতি ফি আরও পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সেবা কমেনি, তাই আগের মতোই ভিড় জমে ক্লিনিকে।
প্রায় চার দশক ধরে এভাবে মানুষের সেবা করে চলেছেন সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মো. এবাদুল্লাহ। শিবপদ বললেন, ‘আমি এবং আমার পরিবার তার কাছ থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি প্রায় ৩০ বছর ধরে। তার ওপর অগাধ বিশ্বাস আমাদের। কী যে ভালো ব্যবহার করেন, যত্ন করে দেখেন_ মনেই হয় না আমরা ৫-১০ টাকার রোগী। তিনি যে ওষধু দেন তাতেই আমাদের রোগ সেরে যায়।’ আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আর বড় রোগের কথা যদি বলেন, সে তো আলাদা কথা। উনি কোটি টাকার ডাক্তারের মতো হাসিমুখে কথা বলেন, পরামর্শ দেন। আর কী চাই আমাদের?’
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন মো:তৌহিদুর রহমান বললেন, ‘বর্তমান সময়ে ৫-১০ টাকা কিছু না। ডা. মো. এবাদুল্লাহ মানুষের সেবায় বলতে গেলে বিনা পারিশ্রমিকে যে অবদান রেখে চলেছেন, তার তুলনা হয় না। জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর_ তিনি এর অনন্য দৃষ্টান্ত।’ মানুষের এত ভালোবাসা পাচ্ছেন যিনি,
সেই ডা. মো. এবাদুল্লাহর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সাতক্ষীরা জেলা শহরের পাকাপুলের মোড় এলাকায় ‘নওয়াব ক্লিনিক’ পরিচালনা করেন তিনি। আলাপচারিতায় বললেন, “আমার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমার দাদা নওয়াব আলী সরদার। দাদা আমাকে বলেছিলেন, মানুষের জন্য ডাক্তার হও। এটা ব্যবসা না। দেখ, সব শ্রেণী-পেশার মানুষই যেন তোমার সেবা পায়। দাদার কথা আমি আজও মনে রেখেছি। এর নামও রেখেছি ‘নওয়াব ক্লিনিক’_ আমার দাদার নামে।”
যেভাবে বেড়ে ওঠা :সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার অজপাড়াগাঁ কাদাকাটি গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম মো. এবাদুল্লাহর। তার বাবা আবদুল মোত্তালেব সরদার। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। স্থানীয় হামিদ আলী হাইস্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে প্রথম শ্রেণীতে এসএসসি পাস করেন তিনি। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭০ সালে খুলনার বিএল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে লেখাপড়ায় বিরতি দিয়ে চলে আসেন নিজের এলাকায়। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন। তাদের সঙ্গেই থাকতেন বিভিন্ন স্থানে। যুদ্ধ শেষে আবারও ফিরে আসেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। ১৯৭৭ সালে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্নি শেষে সহকারী সার্জন হিসেবে যোগ দেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। পরে ১৯৮০ সালে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পল্লী চিকিৎসকদের মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে যোগ দেন। এর পর সরকারি চাকরি নেন মেডিকেল অফিসার হিসেবে। চাকরির শেষ দিকে তিনি সাতক্ষীরার সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন।
শুরু হলো সেবাদান পর্ব :১৯৮০ সাল থেকে মরহুম দাদার কথা রাখতে প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে ডা. এবাদুল্লাহ স্বাস্থ্যসেবা দিতে শুরু করেন। ‘গরিব মানুষের কাছে ফি চাইতে আমার বিবেকে বাধে’_ তাই অফিস শেষে শহরের পাকাপুলের মোড়ে নিজের চেম্বারে তার নূ্যনতম ফি নির্ধারণ করেন মাত্র ৫ টাকা। যাতে বিভিন্ন স্তরের রোগীরা তার কাছে অনায়াসে আসতে পারেন। নিজের ফি বাড়িয়ে তিনি ১০ টাকা করেছেন হাল সময়ে, ২০১৪ সালে। কারণ তার ভাষায়, ‘বেশ কয়েকজন নার্স স্টাফ রয়েছেন। তাদের বেতন দিতে হয়। তারা যাতে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, সেজন্যই ফি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এ টাকা আমি নেই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মানুষের কাছে টাকা নয়, দোয়া চাই। আমার কাছে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের বড় অংশই ভ্যানচালক, রিকশাচালক, খেটে খাওয়া মানুষ। রাস্তায় দেখা হলে আমাকে তারা সালাম দেয়, সম্মান করে_ এটাই আমার বড় পাওয়া।’
চলে আসার সময় কথা হয় ডা. এবাদুল্লাহর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের রিজিয়া খাতুনের সঙ্গে (৫৫)। প্রশংসায় পঞ্চমুখ রিজিয়া বললেন, ‘খালি বিনা ফিতে কেন, অনেক সময় ওষুধও বিনা টাকায় দেন উনি। তার কাছে এলেই আমাদের সমস্যা মিটে যায়। সত্যিই উনি গরিবের বন্ধু।’