ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

হুমকির মুখে সাতক্ষীরার জেয়ালা গ্রামের প্রাণবৈচিত্র্য



সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের সুপ্রাচীন একটি গ্রাম ‘জেয়ালা’। চারদিকে সবুজে ঘেরা এই গ্রামে গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ ও উঠানভরা শাক-সবজি ছিল। সুখে-শান্তিতেই চলছিল প্রাণ-বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ জেয়ালার দুই শতাধিক পরিবারের জীবন-জীবিকা। কিন্তু এই সুখ-শান্তি যেন কপালে সইলো না তাদের। কারণ, ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশংকায় চিন্তিত এখানকার প্রতিটি মানুষ।

 

স্থানীয়রা জানান, জেয়ালা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে গরু-ছাগল ও হাস-মুরগি পালন করা হতো। উঠানে উঠানে ছিল শাক-সবজির সমারোহ। গ্রামে ৫০-৬০টির বেশি গোলা ছিল। শত শত প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছে সবুজে ঘেরা ছিল চারদিক। কিন্তু গত বর্ষা মৌসুমে পার্শ্ববর্তী বদ্দীপুর কলোনী, মাছখোলা ও দামারপোতা গ্রামের ন্যায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় জেয়ালা গ্রামের প্রাণবৈচিত্র্য।

 

স্থানীয় কৃষক ইমদাদুল হক জানান, তার পাঁচ বিঘার ভিটা বাড়িতে আম, জাম, কাঠাল, খেজুর, নারকেল, তাল, সুপারিসহ কয়েক প্রজাতির দুই শতাধিক ফল গাছ ছিল। ছিল সজনে গাছও। গোয়ালে গরু ছিল। বর্ষাকালেও বাড়ির উঠানে লাগাতেন শাক-সবজি। কিন্তু গত বর্ষা মৌসুমে তার বাড়ির উঠানে পানি ওঠে। জলাবদ্ধতায় মরে যায় বেশ কয়েকটি কাঠাল গাছ। মরে যায় সজনে গাছগুলোও। গোয়াল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আর তার পক্ষে গরু পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

তিনি আরও জানান, গত বছর তার ধানের গোলায় পানি উঠেছিল। রাখার জায়গা ছিল না হাস-মুরগি। ভেসে গিয়েছিল দুটি পুকুর। বাড়ির উঠান এবছর মাটি তুলে উঁচু করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। গ্রীষ্মের শেষ দিকের বৃষ্টিতেই উঠানে পানি জমতে শুরু করেছে। কটা ছাগল আছে। কি করবো বুঝতে পারছি না? জলাবদ্ধতার কারণে এভাবেই হুমকির মুখে পড়ছে জেয়ালা গ্রামের প্রাণ বৈচিত্র্য।

স্থানীয় আজিজুর রহমান জানান, আগে জমিতে তিন ফসল হতো। এখন একটা ফসল কোন মতে হয়। তারপরও গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে এখনও কিছু না কিছু আছে। কিন্তু এখনই জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে পরের বছর হয়তো অনেক কিছুই থাকবে না, এক এক করে গ্রাম হয়ে পড়বে শূন্য। দেখা দেবে অপুষ্টি। কর্মহীন হয়ে পড়বে মানুষ। এলাকা ছাড়তে হবে অনেককেই।

 

আর এই জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, হঠাৎ করেই জেয়ালা গ্রামের ধানের জমিগুলো ঘের-বেড়িতে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। চার থেকে পাঁচ মাস জলাবদ্ধ থাকায় মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এই এলাকার মানুষ, প্রাণবৈচিত্র্য। কিন্তু এখনও সতর্ক হলে জেয়ালা গ্রামের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

 

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল গফফার জানান, রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা হলেও আগে দরকার জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা। বাড়ি-ঘরই থাকে না, তার আবার রাস্তাঘাট।

 

এ ব্যাপারে ব্রহ্মরাজপুর ইউপি সদস্য কুরমান আলী বলেন, বেতনা নদী ভরাট হয়ে যাওয়া ও ঘের-বেড়ির কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেয়ালা গ্রাম বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আর জলাবদ্ধতায় এলাকায় কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। গাছপালা, হাস-মুরগি মরে শেষ হয়ে যায়। গরু-ছাগল রাখতে না পেরে অল্প দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় মানুষ। পাশের গ্রামগুলো শেষ হয়ে গেছে। এবার জেয়ালা গ্রামের পালা। কিন্তু কোনভাবেই আমরা তা রক্ষা করতে পারছি না। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

 

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে