ব্রেকিং নিউজঃ

পথে পথে ভোগান্তি আর ঝুঁকি মেনেই নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ , সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের ধীরগতি : লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী  ***  সহায়ক সরকারের একাধিক ফর্মূলার আভাস বিএনপির : শেখ হাসিনার অধিনে নির্বাচনের বিষয়ে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ  ***  সৌদি আরবে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে, আগামীকাল সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উদযাপন হবে ঈদুল ফিতর *** বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ নির্ধারণের লক্ষ্যে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা রোববার অনুষ্ঠিত হবে  ***  কাবা মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে সৌদি আরব  ***  আজীবন নিষিদ্ধ অভিনেতা শাকিব খান: চিত্রপরিচালক গুলজারের পদত্যাগ  ***  ঈদ করতে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফেরা, নিহত ১৬  ***  পাটুরিয়ায় ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় ৪ শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক  ***  একসঙ্গে ৩১ কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করল ভারত  ***  আফগানিস্তানের হেলমান্দে জঙ্গি হামলায় নিহত ৩৪  ***  বাগদাদীকে হত্যা করা হয়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ নিশ্চিত : রাশিয়া

কক্সবাজারে বন্ধ না হয়ে উল্টো বেড়ে গেছে পাহাড় কাটা



কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের পাহাড় সংরক্ষণ নিয়ে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার রায় কার্যকরে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকান্ড আশানুরূপ নয়। অনেক ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনীহা প্রকাশ করছে। ফলে কক্সবাজারে বন্ধ না হয়ে উল্টো বেড়ে গেছে পাহাড় কাটা। এর ফলশ্রুতিতে গত সাত বছরে পাহাড় ধ্বসে দুইশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

 
সর্বশেষ গতকাল ১৪ জুন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ে পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে মোহাম্মদ সেলিম (৪০) ও তাঁর মেয়ে টিসু মনি (৩) নামে দু’জন মারা গেছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ আদালতে গত পাঁচ বছরে কক্সবাজারের পাহাড় সংরক্ষণ নিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ৬ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে একটি। আবার নিষ্পত্তিকৃত মামলায়ও আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছেনা।
সূত্র মতে, মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) গত পাঁচ বছরে ৬ টি কক্সবাজারে পাহাড় সংরক্ষণ নিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলা দায়ের করেছে।

 

মামলার রায় পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্রগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার, চট্রগ্রাম,বান্দরবান,রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড় কাটা বন্ধে চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভুমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, ৫ জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ১৪ জনকে বিবাধী করে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।

 

ওই মামলার প্রেক্ষিতে আদালত এ পাঁচ জেলায় পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এবং ভবিষ্যতে পাহাড় কাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বিবাদীদের নির্দেশ দেন। সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসাইন ২০১২ সালের ২৩ আগষ্ট এ নির্দেশনা দেন। আদালতের এ নির্দেশের ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও চট্রগ্রাম বিভাগের কোথাও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। নেয়া হয়নি জড়িত কোন প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।
এ প্রসঙ্গে ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি ( ইয়েস ) কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী এম,.ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ‘আসলে পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা প্রায়ই শুনি। আসলে প্রভাবশালী কারো বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নেয়না, নেয় শুধু অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে।
একই ভাবে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় ১২৪.৩৫ একর রক্ষিত বন ও ঘোষিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হতে ৫১ একর বনভূমিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য স্থানীয় জেলা প্রশাসন আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বরাদ্দ প্রদান করে।

 

পাহাড় কেটে গড়ে তোলা এ আবাসন প্রকল্পের বরাদ্দ বাতিল, পাহাড় ও বনজ সম্পদ ধ্বংসের বিরূদ্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) মামলা দায়ের করে। ওই মামলার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৮ জুন বরাদ্দ বাতিল, পাহাড় বা পাহাড়ের কোন অংশ কর্তন না করা, রক্ষিত বন এলাকায় সকল ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদ করা এবং বন ধ্বংস না করতে আদেশ দিয়ে রায় প্রদান করেন। কিন্তু আদালতের রায় যথাযত বাস্তবায়ন না হওয়ায় ১২ জন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘বেলা’ আদালত অবমাননা মামলা দায়ের করে।

 

পরবর্তীতে আদালত কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির হয়ে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রার্থনা করলে আদালত সময় মঞ্জুর করেন এবং তিন মাসের মধ্যে সকল স্থাপনা উচ্ছেদ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে অঙ্গিকার করেন কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের পক্ষে রিভিউ করলে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়। তারপরও বর্তমানে ওই এলাকাতে পাহাড় ও গাছ কেটে স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে।

 

অভিযোগ অস্বীকার করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: আলী হোসেন বলেন, ‘আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করছি আদালতের রায় বাস্তবায়নে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে সামান্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, উচ্চ আদালতের প্রতিটি রায় বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। সংবিধানের ম্যান্ডেট হলো আদালতের রায় বাস্তবায়ন। তা না হলে বিকল্প কোনো পথ থাকে না।
তিনি বলেন, জনস্বার্থে করা মামলার রায় বাস্তবায়ন বা কার্যকর না হলে আমরা আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করি। সে ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশে রায় বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। তিনি বলেন, জনস্বার্থে সব মামলার রায় বাস্তবায়ন হলে জনগণ উপকৃত হয়।

 

এইচআরপিবির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাহাড় সংরক্ষণ নিয়ে আইন আছে, আদালতে নির্দেশনা আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কারণেই আজকে এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল। এখন তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করা উচিত। তার সংগঠন আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট বার অডিটোরিয়ামের এক অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি মো: তাফাজ্জাল ইসলাম বলেছেন, জনস্বার্থ মামলা নিয়ে পৃথিবীতে বিপ্লব এসেছে। জনস্বার্থ মামলার ব্যাপারে ভারতের আদালতের পাশাপাশি বাংলাদেশের আদালতও অনেক এগিয়েছে। তবে জনস্বার্থে সব মামলার রায় কার্যকর হওয়া উচিত বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

 

একই অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, আমরা যারা আইনজীবী, মানুষের কাছ থেকে অনেক ইনকাম করি। কিন্তু জনস্বার্থে কিছু করি না। এটি ঠিক নয়। জনস্বার্থে আমাদের কাজ করতে হবে। মানবতার সেবায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে।

 

এ দিকে হাইকোর্ট বিভাগে পাঁচ বছরে কক্সবাজারের পাহাড় সংরক্ষণ নিয়ে ছয়টি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার মধ্যে চট্রগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় পাহাড় কাটা বন্ধ, পাহাড় কেটে গড়ে তোলা সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্প বন্ধ, পাহাড়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্প বন্ধ, পাহাড় কেটে গড়ে উঠা উত্তরণ আবাসন প্রকল্প বাতিল, কক্সবাজার শহরে সিটি কলেজ এলাকায় পাহাড় কাটা বন্ধ ও কক্সবাজার জেলায় পাহাড় কাটা বন্ধ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এএইচ