ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 6 days ago

ষোড়শ সংশোধনী রায় ষড়যন্ত্রের অংশ!



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বিএনপি সাধুবাদ জানালেও ষড়যন্ত্র দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সভা-সমাবেশে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন। ক্ষমতার কোনো চেয়ারে বসে যা খুশি তাই করবেন-তা করা যায় না, এ দেশের জনগণ সময় মতো সঠিক উত্তর দেবে বলেও মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা। ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নেতারা গত কয়েক দিন ধরে প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করছেন। এর মধ্যে রায়ের প্রতিবাদে তিনদিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন ক্ষমতাসীন দল সমর্থক আইনজীবীরা।

 

রায়ের পর্যবেক্ষণের কিছু বিষয়কে অপ্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে এর পেছনে অন্যকোনো ষড়যন্ত্র আছে বলে মত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। বৃহস্পতিবার রাতে গণভবনে দলটির যৌথসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সূচনা বক্তব্যের পর রুদ্ধদার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেন নেতারা। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে কী করা যায়, সে বিষয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের মতামত চান দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে রায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্যকে স্বাগত জানান উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা।

 

আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকজন গণমাধ্যমকে জানান, বৈঠকে সিনিয়র নেতারা বলেন, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে বলা হয়, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক সব দেশে বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট করার ক্ষমতা সংসদের হাতে রয়েছে। একমাত্র সামরিক সরকার শাসিত দেশগুলোতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে এই ক্ষমতা আছে।

 

রায়ের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ‘কোনো একক ব্যক্তির কারণে হয়নি’ বলায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, জাতির জনকের অবদান অস্বীকার করে তিনি কী বুঝাইতে চাচ্ছেন? কারো একক চেষ্টায় কোনো কিছুই হয় না। কিন্তু সব কিছুর পেছনে কারো উদ্যোগ থাকে, প্রেরণা থাকে, সাংগঠনিক ক্ষমতা থাকে এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার শক্তি থাকে। সেই শক্তি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ষোড়শ সংশোধনীর কয়েকটি পর্যবেক্ষণ আপত্তিকর। তবে সুপ্রিম কোর্ট আমাদের প্রতিপক্ষ নয়। কিন্তু বিএনপি ভিন্ন উদ্দেশ্যে আমাদের সুপ্রিমকোর্টের প্রতিপক্ষ বানাতে চাচ্ছে।

 

বৈঠকে তারা বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। রায়ে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষণই বলে দেয়, এ রায়ের পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কতকগুলো পর্যবেক্ষণ আছে, যেগুলো আমাদের কাছে আপত্তিজনক। এতে বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী নেতাদের মতামত গ্রহণ করে ষোড়শ সংশোধনীর যেসব ‘আপত্তিকর’ কথাবার্তা ওঠে এসেছে সেগুলো পরিষ্কার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছেও সেগুলো তুলে ধরতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

 

শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক ছাত্র সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় নিয়ে বিএনপি নতুন করে ষড়যন্ত্রের জাল পুঁতছে। এই ষড়যন্ত্র নিয়ে সতর্ক থাকতে।

 

ওবায়দুল কাদের বলেন, আজকে যারা শেখ হাসিনার উন্নয়নকে সহ্য করতে পারছে না, তারা সুপ্রিমকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এ ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। এই ষড়যন্ত্রের খুঁটি কোথায় কোথায় আছে তা আমরা জানি।

 

তিনি বলেন, বিএনপি আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয়ে ষড়যন্ত্রের জাল পেতেছে। সরকার হটাতে নতুন নতুন ইস্যু খুঁজে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগ কখনও পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। বিএনপির জন্ম হয়েছে বন্দুকের নল দিয়ে। অন্ধকার আর ষড়যন্ত্রের পথ দিয়েই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। সেভাবেই ২০০১-এর ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচন করেছিল, আবার মনে করছে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পর সেই ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচন হবে। কিন্তু সেই রঙিন খোয়াব কর্পুরের মতো উড়ে যাবে।

 

তবে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় নিয়ে নয়, আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে। এ কথা রোববার জানিয়েছেন দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, এই পর্যবেক্ষনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননা করা হয়েছে। কেউ যদি বলে একজন একটা দেশ স্বাধীন করতে পারেনি। একজন একটা দেশ গঠন করতে পারে না। এ উক্তি খুবই দুঃখজনক। রায় নিয়ে নয়, রায়ের বাইরে আমাদের (সংসদ সদস্য) অপরিপক্ক বলা হয়েছে, তা খুবই দুঃখজনক কথা। আমরা লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ।

 

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর তোফায়েল বলেন, বঙ্গবন্ধু যদি ছয়দফা না দিতেন, আগরতলা মামলা হতো না। আর আগরতলা মামলা না হলে আমরা বাঙালি জাতি গণঅভ্যূত্থান সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না। বঙ্গবন্ধু না থাকলে আমরা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হতাম না। ৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী না হলে এ বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। তাই কোন পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এক ব্যক্তির নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয় নাই, তখন দুঃখ প্রকাশ ছাড়া কিছুই বলার থাকে না।

 

তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়ের পর আমরা কোনো মন্তব্য করিনি। কিন্তু বিএনপি আমাদের পদত্যাগের দাবিতে কথা বলতে শুরু করল, অনেক কথা তারা বলা শুরু করল। বিএনপি যখনই এ রায় নিয়ে আনন্দ-উৎসব করে, তখন আমাদের কিছু বক্তব্য না দিয়ে উপায় নেই। বিএনপি এ বিষয়ে যতবার বলবে, তার জবাব আওয়ামী লীগ ততবার দেবে। তবে আমরা মনে করি, এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই ভালো।

 

এদিকে প্রধান বিচারপতির কাছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ করে আপিল বিভাগের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এসকে সিনহা) কাছে সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান তুলে ধরেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শনিবার রাতে প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনে সাক্ষাৎ করে এ অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

 

জানা গেছে, ওই সাক্ষাতে ওবায়দুল কাদের প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছেন, এ রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা অনভিপ্রেত। রায়কে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও পরিস্থিতি তৈরি হোক বা বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের মুখোমুখি অবস্থান সরকার চায় না। তাই রায়ে থাকা অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়ে রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে বিচার বিভাগের দায়িত্ব আছে।

 

বাংলা রিপোর্ট/এফএম