ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

ষোড়শ সংশোধনী রায়ে বিএনপির উল্লসিত হওয়ার কারণ কী?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক

 

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বপ্ন দেখছে বিএনপি। রায়ে নির্বাচন কমিশন, সংসদকে অপরিপক্ক, অকার্যকর এবং নির্বাচন নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে তা ইতিবাচকভাবে দেখছে বিএনপি। দলের নেতারা বলছেন, রায়ের পর্যবেক্ষণ তাদের আশা দেখাচ্ছে। বর্তমান সংসদ অবৈধ ঘোষণা করে রিট হলে তার ফল কী হতে পারে তা নিয়ে দলের ভেতর বিশদ আলোচনাও হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

 

 

রায়ের বিষয়ে দলের করণীয় কী হতে পারে তা নিয়ে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। পূর্ণাঙ্গ রায় বিশ্লেষণ করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একটি সারসংক্ষেপ দিতে আইনজীবীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই সারসংক্ষেপের একটি কপি লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছেও পাঠানো হবে। রায়কে কেন্দ্র করে সহায়ক সরকারের দাবি জোরালো করার চিন্তাভাবনাও আছে দলটির।

 

 

সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার এখন বিচার বিভাগের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। এই রায়ের যে অবজারভেশন, এটা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের কথা৷ সেটাই সুপ্রিমকোর্ট বলেছে৷ সুতরাং দেশের ১৬ কোটি মানুষ এই রায়ের অবজারভেশনের সঙ্গে আছে এবং তারা একমত৷

 

রায় দেয়ার পরে, অবজারভেশন দেয়ার পরে মন্ত্রিসভায় যে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের কিছু মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা যে ভাষায় কথা বলছেন, আমি জানি না আপনারা ভালো বলতে পারবেন, তা আদালত অবমাননার দায়ে পড়ে কি-না৷

 

 

একই দিন ঢাকায় এক আলোচনা সভায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির প্রবণতা বিপজ্জনক৷এটা ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে৷

 

 

জানা গেছে, সরকার সুপ্রিমকোর্টের এই রায়ের ব্যাপারে রিভিউ আবেদন করবে৷ সেই রিভিউ করতে তারা সময় নিতে চায়৷ এক মাসের মধ্যে রিভিউ করতে হলেও এই সময়টি বাড়িয়ে নিতে চায়৷

 

 

এ পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন গণমাধ্যমকে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ তাই সুপ্রিম কোর্টের রায় সবার মেনে নেয়া উচিত, যদি তা কেনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়৷

 

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় অতীতে অনেক সাহসী রায় দিয়েছে৷ আবার এ-ও সত্য যে, অনেক বিচারপতি সামরিক শাসনের সহযোগী হয়েছেন৷ তার বৈধতা দিয়েছেন৷ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিমকোর্ট বিচার বিভাগের স্বাধীনতাই আরো সংহত করেছে৷ এটা একটা ঐতিহাসিক রায় বলে আমি মনে করি৷ আমার মনে হয়, সবার এটা মেনে নেয়া উচিত৷

 

 

রায়ের এক জায়গায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে না হতে পারে তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।’ তিনি মনে করেন, সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণ আস্থা রাখতে পারছে না। এ দুটি প্রতিষ্ঠান যদি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ থেকে বিরত থাকে তাহলে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না।

 

 

এই পর্যবেক্ষণকে খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে বিএনপি। নেতারা মনে করছেন, গত কয়েক বছরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার পর্যবেক্ষণ যথার্থ। এ রায় বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধাক্কা।
সিনিয়র আইনজীবীরা রায়ের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করছেন। এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কী করা যায় তা নিয়েও চিন্তাভাবনা করছেন।

 

 

এ রায়ের অনেক মাজেজা আছে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তাদের মতে, এর মধ্যে ভবিষ্যতের অনেক ইঙ্গিত বহন করছে। পুরো রায় বিশ্লেষণ করলে বিএনপির জন্য আশার পথ দেখতে পান তারা। তাই নতুন হিসাব কষছে বিএনপি।

 

 

১১ আগস্ট শুক্রবার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পর সরকার বিচলিত হয়ে পড়েছে। তাদের অবস্থা এখন নড়বড়ে। তারা নানা রকমের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এ রায় তারা মেনে নিতে পারছে না। এমনকি জনগণের কাছেও যেতে পারছে না।

 

 

‘গত ১ আগস্ট আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ হয়। এতে ষোড়শ সংশোধনী ছাড়াও শাসন বিভাগের নানা দিক নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বর্তমান সংসদকে অপরিপক্ক, অকার্যকর বলেও সমালোচনা করেন।’

 

 

মওদুদ বলেন, মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা কারো ওপর ঈর্ষান্বিত হয়ে অথবা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে এ রায় দেননি। এ রায়ে গত নয় বছরে সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি মানুষের মনের দুঃখ-ব্যথা-বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে এ সরকারের শাসনের নালিশের কিছুটা প্রকাশ পেয়েছে। সরকার গণতন্ত্রের আদলে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

 

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিষয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দেয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে আদালতকে হেয় করে বক্তব্য দেয়ায় তিন দিনব্যাপী বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।

 

 

শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

 

 

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সুপ্রিমকোর্টকে হেয়প্রতিপন্ন করে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য প্রদানের প্রতিবাদে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি বিধিমালার গেজেট প্রকাশের দাবিতে আগামী রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার সারাদেশে সব বারে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম।

 

 

এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সর্বোচ্চ আদালতের রায় নিয়ে যে তিক্ত ও প্রতিহিংসামূলক সমালোচনা করেছেন, সেটা তার চাকরির আচরণবিধির পরিপন্থী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এ বি এম খায়রুল হক দেশকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকই দায়ী।

 

 

এদিকে ১১ আগস্ট শুক্রবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত অপশক্তিকে মোকাবেলায় মানসিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

 

 

ওবায়দুল কাদের বলেন, আবার আমরা দুঃসময়ে পতিত হয়েছি, চক্রান্তের মুখে পতিত হয়েছি, আবারও ষড়যন্ত্র চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য এ ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বিএনপি বিষধর সাপের মতো, সুযোগ পেলেই ছোবল মারে। ইস্যুর পর ইস্যু খোঁজে, কিন্তু আন্দোলনে মাঠে থাকে না। আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে তারা সুপ্রিমকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে মনে হয় ক্ষমতার সিংহদ্বারে পৌঁছে গেছে। গর্ত থেকে ওঠে আবার লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরাই আবার জয়ী হবো এবং সরকার গঠন করবো।

 

বাংলা রিপোর্ট/এফএম