ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

সাহিত্যাঙ্গনে নারীদের লেখনী শক্তি বাড়াতে মিনু মমতাজ



খুলনা থেকে নিপা মোনালিসা:
খুলনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মিনু মমতাজের সম্পৃক্ততা বহুদিনের। শুধু কবিতা, স্মৃতিকথা, গল্প বা প্রবন্ধ লেখা নয়। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনারও দায়িত্ব পালন করছেন। নারীদের লেখনীশক্তিকে বাড়ানোর জন্যও নিরলস কাজ করে চলেছেন তিনি। তাদের লেখনীশক্তিকে সকল মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার আঙ্গিকে গড়ে তুলেছেন তন্ময় প্রকাশনী। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এ সংগঠনটিকে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থানে এনেছেন তিনি।

 

 

খুলনার একমাত্র নারী প্রকাশক হিসেবে মিনু মমতাজের নাম উল্লেখযোগ্য। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উপস্থাপনা, বিতর্ক ও নতুন কুড়ি প্রতিযোগীতার বিচারকসহ গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি তার। নিজের লেখনীশক্তি দ্বারা সাহিত্য অঙ্গনের একটি বিশেষ স্থান আজ তার দখলে। পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় নারীদের উদ্বুদ্ধ করে তুলেছেন তিনি। নিজেই আবার তাদের লেখাগুলো সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব নিচ্ছেন।
এর আগে একজন সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব সম্পর্কে নিজেরও তেমন কিছু জানা ছিল না তার। সুলতানা রিজিয়ার সম্রাজ্ঞী লেখাটি পড়ার মাধ্যমে তার মধ্যে প্রকাশক হয়ে ওঠার ইচ্ছা কাজ করে। নিজের প্রচেষ্টায় শিখে নেন একজন সম্পাদক ও প্রকাশকের কাজ।

 

 

পরবর্তীতে ২০০২ সালে নিজেই গড়ে তোলেন তন্ময় প্রকাশনী। হোসনে আরা মাহমুদ লিলি’র অস্ফুট পংক্তিমালা প্রকাশের মধ্য দিয়ে এ প্রকাশনীটির যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য সাহিত্যাঙ্গনে নারীদের পদচারণা বৃদ্ধি। তাদের লেখনী সকলের কাছে পৌছানো। এসব কাজে পরিবার থেকে পেয়েছেন অনেক উৎসাহ। কিন্তু সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও কম ছিল না। এ কাজে অনেক সময় তার প্রকাশকের পারিশ্রমিকটাও পান না তিনি। এখনও পর্যন্ত লেখিকাদের উদ্ধুদ্ধ করার মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকাশনার কাজ। তবে একটি গ্রন্থ প্রকাশের পর তার আত্মতৃপ্তি বেড়ে যায় অনেকখানি। বই বিনিময়ের মাধ্যমে এপার বাংলার সাথে ওপার বাংলার একটি যোগসূত্র স্থাপন করেছে তার এই সংগঠনটি।

 
এ পর্যন্ত নিজের সম্পাদনা ও প্রকাশনায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৯টি। আর তার লেখা প্রকাশিত গ্রন্থ ও সংকলন এর মধ্যে সাহিত্য সংকলন রয়েছে ১২টি। একক গ্রন্থ ৭টি। মিনু মমতাজের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে মধ্যরাতের জানালায়। এটি ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়। তার লেখা গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি হচ্ছে বিসমিল্লাহ, সূর্য শিশির প্রজাপতি, আল-হামদুল্লিাহ্, বেতালা ছন্দ, সুবহানাল্লাহ্ প্রভৃতি।

 
আগামীতে তার প্রকাশিতব্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তার লেখা নারী অধিকার নিয়ে অক্ষম জ্ঞান ও নিরর্থক হৈ চৈ গ্রন্থ। এছাড়া সৈয়দ আলী হাকিমের নজরুল সাহিত্যের নতুন দিগন্ত, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি সংকলন গৃহস্থালীর আর্তনাদ(২য় খন্ড), মোহাঃ কামরুজ্জামানের কাব্যগ্রন্থ পাতাবাহার ও ইত্যাদি এবং সংকলন গ্রন্থ অধ্যক্ষ রুহুল আমিন স্মৃতি স্মারক।

 
মিনু মমতাজ খুলনা মহানগরীর সাউথ সেন্ট্রাল রোড (মধ্যম পাড়া) এর বাসিন্দা। পেশাজীবনে তিনি নগরীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের জীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তার স্বামী আমীন মোঃ মঞ্জুর মোর্শেদ খুলনা কলেজ এর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চতুর্থ শ্রেণী থেকেই সাহিত্যচর্চায় পারদর্শী মিনু মমতাজ। তার বাড়িতেই ছিল একটি বইয়ের লাইব্রেরী। সেখান থেকে বই পড়েই লেখার প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই সময়ের কিশোর বাংলা নামক পত্রিকায় মনিমালা ছদ্মনামে তার লেখা একটি ছড়া প্রথম প্রকাশিত হয়। তবে বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়া স্বত্তেও ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার।

 

 

ওস্তাদ আব্দুল মালিক চিশতী ও স্বার্থকী’র কাছে গান শিখেছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত করতে খুব ভালবাসতেন তিনি। তবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে সঙ্গীত থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বিয়ের পর আর বাইরে কোথাও গাওয়া হয়নি তার। তিনি নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র জেলা শাখার সহ সভাপতি’র দায়িত্ব পালন করছেন।

 
এছাড়া তিনি অসংখ্য সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন। শিশু সাহিত্য পত্রিকা ঘাসফুল এর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার এর কবিতা ও কথিকা পাঠকও। ঢাকার অবিনশ্বর সাহিত্য পত্রিকা এর খুলনা প্রতিনিধির দায়িত্বেও আছেন তিনি। ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। এছাড়া রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিক, দেশত্ববোধক সংগীত, পল্লীগীতিসহ হামদ, নাত, কবিতা, আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা, চিত্রাঙ্কন, অবিরাম গল্প বলা, খেলাধুলা প্রভৃতি বিষয়ে বহু সনদপত্রের স্বীকৃতি অর্জন করেছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রবীণ সেবায় অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে মমতাময়ী পুরস্কার লাভ।

 
রাইটার্স ক্লাব কর্তৃক প্রদত্ত কবিরত্ন সনদ লাভ। বিশ্ব বাংলা ফাউন্ডেশন প্রদত্ত সাহিত্য পদক লাভ করেন। তিনি কেন্দ্রীয় নন্দিনী ঢাকাসহ কয়েকটি শাখা থেকে সাংগঠনিক ও সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ নন্দিনী পদক লাভ করেছেন। খুলনা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থা কর্তৃক মাতৃভাষা স্বর্ণপদকও পেয়েছেন তিনি।

 
২০০৮, ২০১০ ও ২০১১ সালে নগরীর জাতিসংঘ পার্কে খুলনা একুশে বই মেলার উদ্যোক্তা ও মূখ্য আয়োজক হিসেবে কেবলমাত্র নারীদের দ্বারা এমন উদ্যোগের ব্যাপক পরিচিতি ও স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি।

 

 

এ নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার। এতে বাবা অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। নিজে বসে থেকে গান শেখাতেন আমাকে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় সেটি আর হয়ে ওঠেনি। লেখালেখিও করছি সেই থেকে। বিভিন্ন বই পড়ে এর প্রতি উৎসাহ পেয়েছি আমি। আর মূলত নিজের জীবনের প্রেক্ষাপট থেকেই লেখার উৎসাহ পেয়েছি। মেয়েদের লেখনীশক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এখনো উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। এ কাজে তেমন লাভ না থাকলেও প্রকাশনীটি আজও টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।

 
এ দূরাহ কাজটি তাকে করতে বেশ প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে। তবে একটি গ্রন্থ প্রকাশের পর তার আত্মতৃপ্তি বেড়ে যায় অনেকখানি এমনটিই জানিয়েছেন তিনি। অনেক সাহিত্য সংগঠন প্রকাশকের কাজ করে থাকলেও প্রকাশনা সংস্থা খুলেছে এমন উল্লেখযোগ্য কোন সংস্থা খুলনায় আছে বলে তার জানা নেই বলে জানান তিনি।’

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এএইচ