ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 2 months ago

বাবরি মসজিদের স্থানে কি রাম মন্দির নির্মিত হতে যাচ্ছে?



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

রাম মন্দির থাকবে নাকি বাবরি মসজিদ থাকবে নাকি উভয়ই রাখা উচিত এমন অপশন দিয়ে অনলাইনে ভোট হয়েছিলো। ভারতের অযোদ্ধা নগরীতে রাম মন্দির ও বাবরি মসজিদ ইস্যুতে জাগো ইন্ডিয়ান ডটকম ওয়েবসাইটে এ নির্বাচন হয়। তবে নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে বাবরি মসজিদ।

 

অযোধ্যা বিতর্কে কি এবার ইতি পড়বে? অন্তত সুপ্রিম কোর্ট তাই চাইছে। শুক্রবার এ নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল সর্বোচ্চ আদালত।

 

হাতে আর চার মাস সময়। তার পরেই শেষ হয়ে যাবে শুনানি। শুক্রবার অযোধ্যার জমি বিতর্ক নিয়ে মামলার শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিল, ৫ ডিসেম্বর হবে চূড়ান্ত শুনানি। এর পরে কোনও পক্ষের কোনও দাবি শুনবে না আদালত। এই ১২ সপ্তাহের মধ্যে এই সংক্রান্ত যাবতীয় নথি ইংরেজিতে অনুবাদ করে জমা দিতে হবে আদালতে। এখন মোট আটটি ভাষায় অযোধ্যার জমি সংক্রান্ত নথি জমা পড়েছে আদালতে।

 

১৯৯২ সালে রামজন্মভূমি আন্দোলনে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে চূড়ায় গেরুয়া পতকা তোলে করসেবকরা। ২.৭৩ একর জমি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় সেই সময়ে। আগামী ৫ ডিসেম্বর সেই ঘটনার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। আর সেই দিনেই অযোধ্যায় রাম জন্মভূমি হিসেবে দাবি করে আসা জমি নিয়ে মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হতে চলেছে। চলবে একটানা।

উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয় এবং যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে রামমন্দির নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠে হিন্দু বাহিনী। বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী দাবি করেছিলেন, ২০১৮ সালেই মন্দির নির্মাণ শুরু হয়ে যাবে। সেটা হবে কিনা ভবিষ্যৎ বলবে তবে এটা ঠিক যে দীর্ঘ দিনের বিবাদ মেটাতে এ বার সুপ্রিম কোর্ট যে কড়া মনোভাব দেখিয়েছে তাতে ২০১৮ সালের মধ্যে দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে কোনও সমাধান সূত্র মিলতে পারে।

 

এ দিন সুপ্রিম কোর্ট উত্তরপ্রদেশ সরকারকেও নির্দেশ দিয়ে বলেছে, দশ সপ্তাহের মধ্যে সরকারের হাতে থাকা জমি সংক্রান্ত সব নথি ইংরেজিতে অনুবাদ করে জমা দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট কড়া মনোভাব দেখিয়ে বলেছে, এই সময়সীমা কোনও ভাবেই বাড়ানো যাবে না। কোনও ওজর, আপত্তিতে কান দেবে না আদালত।

 

উল্লেখ্য, গত ৮ অগস্ট সিয়া ওয়াকফ বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে বলে, অযোধ্যায় রামের জন্মস্থানে রামমন্দির নির্মাণ হোক। কাছাকাছি কোথাও তৈরি হোক মসজিদ। এই প্রস্তাবের পরে সিয়া ওয়াকফের হাতেই বাবরি মসজিদ থাকায় এই মামলায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা করেছেন অনেকে।

 

কিন্তু শিয়া ওয়াকফ বোর্ড এই ধরনের প্রস্তাব মুসলমানদের তরফ থেকে কীভাবে দিতে পারে, সেই প্রশ্নের জবাবও দিয়েছে বোর্ড। তাঁদের মতে, ‘‘বাবরি মসজিদ শিয়া ওয়াকফের অধীনে ছিল। ফলে উত্তর প্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল বোর্ড এই নিয়ে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের একমাত্র পক্ষ।’’

 

এই হলফনামায় সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকেও একহাত নিয়েছে শিয়া ওয়াকফ বোর্ড। সুন্নি বোর্ড কট্টরপন্থীদের হাতে রয়েছে এবং তারা কখনওই শান্তিতে বিশ্বাস করে না বলে অভিযোগ করেছে শিয়া বোর্ড।

 

সর্বভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শিয়া ওয়াকফ বোর্ড আদালতের ১৯৪৬ সালের একটি রায়কে চ্যালেঞ্জ জানাবে বলে ঠিক করেছে। সেই রায়ে সুন্নি বোর্ডকে বাবরি মসজিদের মালিকানা দেওয়া হয়েছিল।

 

সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই ৩ বিচারপতিকে নিয়ে একটি বেঞ্চ গঠন করেছে যাঁরা অযোধ্যার বিতর্কিত জমি নিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা হয়েছে, তার শুনানি শুরু হবে ১১ অগাস্ট থেকে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট অযোধ্যার বিতর্কিত জমিকে বিবাদি পক্ষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার রায় দিয়েছিল।

 

উত্তরপ্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডের তরফে হলফনামায় লেখা হয়েছে, ‘‘আমাদের মতে দুই বিবাদি পক্ষের উপাসনার স্থান, মসজিদ ও মন্দির যতটা দূরে রাখা যায় ততই ভাল। কারণ দুই গোষ্ঠীই লাউডস্পিকার ব্যবহার করলে তার ফলে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে ব্যাঘাত ঘটে। এতে বিদ্বেষ বাড়ে।’’

 

তাঁরা আরও জানিয়েছেন, ‘‘শান্তি আনার জন্য মসজিদকে মর্যাদা পুরষোত্তম শ্রীরামের পূণ্য জন্মভূমি থেকে যথাযথ দূরত্বে কোনও মুসলমান-অধ্যুষিত এলাকায় নিয়ে যাওয়া যায়।’’

রামমন্দির ও বাবরি মসজিদের ইতিহাস

বাবর ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ভারতের কিছু অংশ দখল করেন। কিন্তু তাই বলে তাকে মোগল সাম্রাজ্যের স্খাপক বলা যায় না। কারণ কোনো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে কেবল বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগ দখল করলে হয় না, সেখানে প্রতিষ্ঠা করতে হয় প্রশাসন। কিন্তু শাসনসংক্রান্ত সংগঠন গড়ে তোলার আগেই বাবর মারা যান। বাবরি মসজিদ বাবর নির্মাণ করেননি। বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন বাবরের সাথে আগত মীর বাকী নামে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। বাবরি মসজিদের মধ্যে প্রাপ্ত প্রস্তরফলক থেকে জানা যায়, মীর বাকী মসজিদটি স্খাপন করেন ৯৩৫ হিজরিতে, খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে যা দাঁড়ায় ১৫২৮।

 

বাবরি মসজিদ একটি মামুলি মসজিদ মাত্র; যা কোনো উন্নত স্খাপত্যের নিদর্শন নয়। বাবর উত্তর ভারতে আসার আগেই উত্তর ভারতে মুসলিম স্খাপত্যের বিশেষ রীতি গড়ে উঠেছিল। তা গড়ে উঠেছিল মিনার, গম্বুজ ও প্রকৃত খিলানকে নির্ভর করে। কেবল উত্তর ভারতে নয়, দক্ষিণ ভারতে বাহমনি সুলতানদের নেতৃত্বেও গড়ে ওঠে একটা বিশিষ্ট মুসলিম স্খাপত্য রীতি। বাবরি মসজিদের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় আসতে পেরেছে। তাই এই মসজিদকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সঙ্ঘাতের কারণ ঘটছে।

 

হিন্দুদের বিশ্বাস, ‘অযোধ্যাই ছিল রাজা রামের রাজত্বের রাজধানী। রাম কেবল রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিষ্ণুর অবতার। রামের মৃত্যুর পর অযোধ্যায় স্খাপিত হয় রাম মন্দির। মীর বাকী এই রাম মন্দির ভেঙে সেখানে নির্মাণ করেন বাবরের নামে বাবরি মসজিদ।’ রামায়ণ ভারতের বিখ্যাত একটি কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থে বলা হয়েছে, অযোধ্যা রামের জন্মভূমি।

 

কিন্তু রামায়ণের বর্ণনা অনুসরণ করে এ পর্যন্ত অযোধ্যায় কোনো প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়নি; যেমন আবিষ্কৃত হতে পেরেছে গ্রিক কবি হোমারের ইলিয়াড কাব্যগ্রন্থের বর্ণনা অনুসরণ করে ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ। ইলিয়াডের রচনাকাল ধরা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০ অব্দের কাছাকাছি।

 

ইলিয়াডের ঘটনার সাথে রামায়ণের ঘটনার কিছু কিছু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। এটা প্রাচীন গ্রিকদের প্রভাবের ফল কি না বলা যায় না। রামায়ণে পাওয়া যায় শ্রীলঙ্কার বর্ণনা। শ্রীলঙ্কার রাজা রাবণ রামের স্ত্রী সীতাকে চুরি করে নিয়ে যান। ফলে বাধে রাম-রাবণের যুদ্ধ। রামায়ণে রাবণের রাজধানী কনকলঙ্কার বিশেষ প্রশংসাপূর্ণ বর্ণনা আছে।

 

কিন্তু শ্রীলঙ্কাতেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়নি। হোমারের বর্ণনা অনুসরণ করে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হতে পেরেছে তুরস্কে। কিন্তু রামায়ণের বর্ণনা অনুসরণ করে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এখনো সম্ভব হয়নি।

 

তাই বলা যায় না, যেখানে বাবরি মসজিদ অবস্খিত, এক সময় সেখানে ছিল রাম মন্দির। হতে পারে রামায়ণের কাহিনীর উদ্ভব ভারতে হয়নি, এই কাহিনীর কাঠামো এসেছে বাইরে থেকে। তবে বিষয়টি গবেষক মহলে হয়ে আছে বিতর্কমূলক। কিন্তু এহলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয়ার সময় বলেছেন, হিন্দুরা যেহেতু বিশ্বাস করে, রামের জন্মভুমি অযোধ্যা।

 

তাই তাদের সেই বিশ্বাসকে মর্যাদা দিতে হবে। আর ছেড়ে দিতে হবে বাবরি মসজিদের ওয়াক্ফর তিন ভাগের দুই ভাগ জায়গা।’ বিষয়টি বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে অনেকের মনে। কারণ এহলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় প্রদান করেছেন হিন্দু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে, আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নয়।

২০১০ সালের আদালতের রায়:
২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরী মসজিদ যে স্থানে ছিল সেই ভূমি সম্পর্কিত রায় দেয়।এলাহবাদ হাইকোর্টের তিন জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাদের রায়ে ২.৭৭ বা ১.১২ হেক্টর ভূমি সমান তিনভাগে ভাগকরার রায় প্রদান করেন। যার এক অংশ পাবে হিন্দু মহাসভা রাম জন্মভূমিতে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য,দ্বিতীয় অংশ পাবে ইসলামিক সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এবং বাকি তৃতীয় অংশ পাবে নির্মোহী আখরা নামে একটি হিন্দু সংগঠন।

 

এই স্থানে রামমন্দির ধ্বংস বাবরী মসজিদ নির্মিত হয়েছিল এ বিষয়ে তিন জন বিচারকের দুজন একমত হয়েছিলেন। তবে তিন জন বিচারকই এই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান যে,পূর্বে বাবরী মসজিদের স্থলে একটি সুপ্রাচীন হিন্দু মন্দির বিদ্যমান ছিল। আদালতের তিন জন বিচারপতিঃ বিচারপতি এস আর আলম,বিচারপতি ভানওয়ার সিং এবং বিচারপতি খেমকারণের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের আদেশে আরকিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া ওই স্থান খনন করে একটি সুবৃহৎ হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্যের সন্ধান পায়।

বংলা রিপোর্ট ডটকম/এইচএম