ব্রেকিং নিউজঃ

পথে পথে ভোগান্তি আর ঝুঁকি মেনেই নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ , সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের ধীরগতি : লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী  ***  সহায়ক সরকারের একাধিক ফর্মূলার আভাস বিএনপির : শেখ হাসিনার অধিনে নির্বাচনের বিষয়ে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ  ***  সৌদি আরবে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে, আগামীকাল সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উদযাপন হবে ঈদুল ফিতর *** বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ নির্ধারণের লক্ষ্যে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা রোববার অনুষ্ঠিত হবে  ***  কাবা মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে সৌদি আরব  ***  আজীবন নিষিদ্ধ অভিনেতা শাকিব খান: চিত্রপরিচালক গুলজারের পদত্যাগ  ***  ঈদ করতে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফেরা, নিহত ১৬  ***  পাটুরিয়ায় ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় ৪ শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক  ***  একসঙ্গে ৩১ কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করল ভারত  ***  আফগানিস্তানের হেলমান্দে জঙ্গি হামলায় নিহত ৩৪  ***  বাগদাদীকে হত্যা করা হয়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ নিশ্চিত : রাশিয়া

ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাত : প্রয়োজন ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সুশাসন



মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করেছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা ‘। ১০নং মহাবিপদ সংকেত পূর্বেই জারি করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর মঙ্গলবার জানায় ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ কক্সবাজার, সেন্টমান্টিন উপকূল অতিক্রম করে ভারতের মণিপুরের দিকে ধাবিত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ১০নং মহাবিপদ সংকেত প্রত্যাহার করে ৩নং সতর্ক সংকেত জারি করে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা ‘ দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা ‘ আঘাতে ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণের জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাৎক্ষণিক ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ও ১৪ হাজার মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা‘র আঘাতে কক্সবাজার, বান্দরবান ও ভোলাসহ সারাদেশে  ছয়জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ১০০ কিমি থেকে ১৪০ কিমি ঘণ্টায় বয়ে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ে সারাদেশে আটজন মানুষ নিহত হয়েছেন। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গণমাধ্যমের সাথে আলোচনায় জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা ‘র আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৫২ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তন্মধ্যে ১৭ হাজার ঘর-বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের এই বিধ্বস্ত ঘর-বাড়ি নির্মাণে সরকার পরিবারপ্রতি ১ বান্ডিল টিন ও ২০ হাজার টাকা অনুদান দেবেন। গণমাধ্যম সূত্রে আরও খবর পাওয়া যায়, ‘মোরা’র আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১ হাজার কিমি বেড়িবাঁধ জোয়ারের পানির তোড়ে ভেসে যায়। জানা যায়, সেন্টমার্টিন এলাকায় ১৪৫ কিমি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেন্টমার্টিনের ৭০% কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই এলাকায় ৪ জন মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১০ জন। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে উপকূলীয় এলাকা কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন এসব এলাকায় বড় বড় গাছপালা উপড়ে, ভেঙে পড়ে যাতায়াত ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে আক্রান্ত এলাকায় বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবহাওয়া অধিদপ্তর গত সোমবার বিকাল থেকে ১০নং মহাবিপদ সংকেত জারি করে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন মানুষজন গৃহপালিত পশু-পক্ষী সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণের আহ্বান জানায়। ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় এলাকায় ৪,৬৮,০০০ লোক আশ্রয় গ্রহণ করে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহণ সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জানান যে, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা‘র আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় ২০ হাজার ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নৌবাহিনী ২টি ত্রাণবাহী জাহাজ ত্রাণ নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব একসঙ্গে বিদেশ সফর প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন পরিপন্থী। উল্লেখ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব একসঙ্গে বিদেশ সফররত মর্মে সূত্র জানায়।

গণমাধ্যমে আর একটি খবর প্রকাশিত হয় যে, প্রধানমন্ত্রী ভিয়েনা থেকে দুর্যোগ মোকাবিলার খোঁজ-খবর রাখছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী সোমবার সকালে আনবিক শক্তি কমিশনের (আইইএ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যোগদানের নিমিত্ত অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় গমন করেন।

তাছাড়া গণমাধ্যম সূত্রে অন্য খবরে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নেতাকর্মীদের ত্রাণ কার্যে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ১৯৭০ সালের মহাপ্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস মহাবিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে নিকট অতীতে ১৯৮৮, ১৯৯১’র ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের ‘সিডর’ ২০০৯ সালের ‘আইলা’ ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান সফলতা অর্জন করেছে। তাছাড়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংকেত ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, আধুনিকায়নের কারণে ‘পূর্বাভাস’ সঠিক সময় দিতে পারায় এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের ব্যবস্থাপনায় দর্শনীয় সফলতা লাভ করেছিল ধরে নেয়া যায়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার, মাটির কেল্লা ইত্যাদি নির্মাণের কারণে মানুষজন, পশু-পাখিকে সঠিক সময় বিপদের মহা-পূর্বাভাস পেলে আশ্রয় দেয়া সম্ভব হয় বলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। সরকারের পাশাপাশি ‘স্বেচ্ছাসেবী’ সংগঠনের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। বিশেষ করে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয়।

আলোচ্য ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা‘র ক্ষেত্রে মহাবিপদ সংকেত দেয়া হলেও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ কৃপায় এই ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ কম থাকায় প্রাণহানি কম হয়। এবং ঘূর্ণিঝড় সমুদ্রে ভাটার সময় আঘাত করায় ক্ষয়-ক্ষতির যে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে তা সামগ্রিক ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণের পর বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।

এখন সর্বাগ্রে দরকার সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ির মানুষের আশ্রয়দানের জন্য তাবু সরবরাহ প্রয়োজন। সঙ্গে শুকনা খাবার-ওষুধ, পথ্য বিতরণ জরুরি। তাছাড়া শিশু খাদ্য, মায়ের খাবার, গর্ভবতী মায়ের খাবার, ওষুধ পরিচর্যার ব্যবস্থা প্রয়োজন। আর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স-ডাক্তার পর্যাপ্ত ওষুধসহ দুর্গত এলাকায় নিয়োজিত করা জরুরি। দুর্গত এলাকায় মানুষের হাতে নগদ টাকা, খাদ্য ত্রাণ হিসেবে দেয়া দরকার। তারপর আসে পুনর্বাসন। পুনর্বাসন প্রধানত: দুই প্রকারে করা যায়। প্রথমত: সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি পুন:নির্মাণে নির্মাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ দেয়া প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে আরও গবেষণার মাধ্যমে সরকার উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। উপকূলীয় বড় বড় ঘূর্ণিঝড় শুধু নয়, প্রতিবছর, প্রতিক্ষণে, প্রতিনিয়ত ঝড়ো হাওয়ার গতিবেগ একটু বৃদ্ধি পেলেই এসব এলাকার মানুষের নিত্য এরকম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই নিরাপদ দূরত্বে সরকারি খরচে উপকূলীয় মানুষের আবাসনের ব্যবস্থার লক্ষ্যে সরকার প্রকল্প গ্রহণ করলে ক্ষয়-ক্ষতি যেমন কমানো যাবে, তেমনি ত্রাণের নামে নানা অনিয়ম-অপচয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ফলে সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ হ্রাস পাবে। তাই এ লক্ষ্যে সরকার গবেষণার ফলাফলের মাধ্যমে পাইলট প্রকল্প হাতে নিতে পারে। দ্বিতীয়ত: উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, কালভার্ট, বিদ্যুতের খুঁটি, তার, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণে পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পুনর্বাসন দরকার বেড়িবাঁধ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বোল্ডার নির্মাণে সরকারি প্রকল্প গ্রহণ। এতদ্ব্যতীত ধান ক্ষেত, পুকুর, জলাশয়, মৎস্য খামার, মুরগী-গরু খামার ইত্যাদিসহ ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ করে সহজ কিস্তিতে স্বল্প সুদে, বিনাসুদে পুনর্বাসন-ঋণ দেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রকৃতি প্রদত্ত হারের তুলনায় মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ অধিকমাত্রায় মানুষকে নাকাল করছে। গ্রীন হাউস গ্যাস, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সিএফসি ইত্যাদি কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের ‘মোরা’র মত ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিকর এসব গ্যাস বাংলাদেশ উৎপাদন করে খুবই কম। কিন্তু উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ এই দুর্যোগের নির্মম শিকার হচ্ছে অধিক মাত্রায়। জলবায়ুর পরিবর্তনে ‘অভিযোজনের’ জন্য বাংলাদেশ প্রতিশ্রুত ফান্ড উন্নত বিশ্ব থেকে যাচ্ছে সীমিত আকারে।

অন্যদিকে প্রাপ্ত ফান্ড ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের অভাবে এসব অর্থ থেকে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তাই ‘মোরা’ পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সরকারের উপযুক্ত পরিকল্পনা ও গবেষণা দরকার। আর প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হস্ত প্রসারণ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য উপকার করতে পারে। তবে সবক্ষেত্রে প্রয়োজন সুশাসন নিশ্চিতকরণ।

 

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/মসি খাঁ