ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 5 months ago

যেভাবে দিন কাটছে হাওরের মানুষের



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক

হাওরে দূর্যোগ। ফসলহানি। প্রাণহানি। কান্না। হাহাকার! সহায়-সম্বল হারানোর আর্তনাদ। অকালে বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ফসল, ভাসিয়ে নিয়ে গেছে হাওর মানুষের আনন্দ ও সুখ! হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান আবাদ করে সুখের স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষকরা! ধান প্রায়ই ঘরে তোলার উপযোগী যখন হচ্ছিল তখনই অকাল বন্যা, অঝোর ও ভারী বৃষ্টি তছনছ করে দিয়েছে হাওরের মানুষের সুখের সংসার, ভেঙেছে তাদের ভালো থাকার, স্বচ্ছল থাকার স্বপ্ন। স্বপ্ন ও আশাভঙ্গের বেদনায় এখন কাতর সকল হাওরবাসীর! হাওরের দু’কোটি মানুষের মধ্যে অধিকাংশই নিম্ন আয়ের।

প্রতিদিন, প্রতিরাত হাওরের মানুষের কাছে চলে আসে বাঁধ ভাঙার খবর, ফসল ডুবার করুণ কাহিনী। ফসলের জমিনের ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে হাওর মানুষের মনের জমিনও! তাই আর্তনাদ শোনা যায় প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে, প্রতিটি জেলের বাড়িতে, প্রতিটি পেশাজীবীর বাড়িতে এবং প্রতিটি ব্যবসায়ীর বাড়িতে! তাঁরা অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকেন কষ্টে, খরচে, সংগ্রামে ফলানো ধানের জমিনের দিকে। তবে তাঁদের কোন রাগ নেই, অভিমান নেই! তাঁরা কেবল আকাশের দিকে ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকেন বৃষ্টি কমানোর ক্ষীণ আশায়!

গবেষকেরা বলছেন, পানিতে অক্সিজেন কমে গেছে, অতিরিক্ত এমোনিয়া তৈরি হয়েছে। কৃষকরা কিন্তু অক্সিজেন এমোনিয়া বুঝেন না। তাঁরা বুঝেন তাঁদের প্রাণের ধান পচে গিয়ে পানি দূষিত হয়েছে। মাছ মরে যাচ্ছে। মরে ভেসে উঠছে পানির উপর। গবেষকরা বলছেন, প্রায় ৭০ কোটি টাকার মাছ মরে গেছে। ১০০ কোটি টাকার ধান ক্ষতি হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। আর্থিক ক্ষতির চেয়ে মানসিক ক্ষতির পরিমাণ পূরণ করার মতো নয়!

হাওর পাড়ের মানুষেরা হাওরের ধান, মাছ, প্রাণবৈচিত্র্যর উপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। খাদ্য, পুষ্টির জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হাওরের প্রাণবৈচিত্র্যর উপর। হাওরে দেখা গেছে, বোয়াল, আইড়, গুলশা, টেংরা, মেনি, পুটি, কালিবাউশ, বাইম, চিকড়া, কার্পূ, কই, গুজি মরে ভেসে উঠছে। তাদের স্বপ্নের সমাধি হয়েছে চোখের সামনেই। হাওর পাড়ের দু’কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, পেশার নিরাপত্তা কে দেবে?

হাওরে আছে হাজার হাজার জেলে পরিবার। তাঁরা পেশা হারিয়ে নগরে স্থান নেবেন। বাড়বে নগর দারিদ্রতা। আজ শেষ পর্যন্ত হাওরের ‘শস্যভান্ডার’ বলে খ্যাত পাকনার হাওরও ডুবে গেছে। হাওরে এখন শুধুই হাহাকার! আগামী দিনগুলোতে মাছের আকাল দেখা দেবে। জেলেরা পেশাহীন হয়ে পড়বে। কৃষক তো এমনি ছয়মাস পেশাহীন, কর্মহীন থাকেন। জালিয়ার হাওরের কৃষক এলাল উদ্দিন, কুবিজানা হাওরের কৃষক কৃষক সুলতান, আবুছান কাজের সন্ধ্যানে গ্রাম ছেড়েছেন। এতবড় দুঃখ কিভাবে সামাল দিবেন হাওরের কৃষকরা ?

হাওর ডুবে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও চরম দুর্ভোগে! তাদের জ্ঞার্নাজনে ছেদ পড়েছে। তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে, তলিয়ে গেছে অনেকের বসতভিটাও! তলিয়ে গেছে শিক্ষার্থীর বাড়ি, শিক্ষকের বাড়িঘর! আশু চাহিদা যেখানে অপ্রতুল সেখানে অন্য চাহিদা পূরণ করা কতটা যৌক্তিক, কতটা প্রাসঙ্গিক তা প্রশ্নসাপেক্ষ বটে! শিক্ষার্থীরা তাই স্কুল, কলেজে যেতে পারছেনা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুল ও কলেজে তারা যেতে পারে না!

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হাওরে ফসল তোলার উৎসব হওয়ার কথা! অথচ তারা এখন আশু চাহিদা পূরণের জন্য ত্রাণ পাবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন প্রতিদিন। নতুন স্বপ্ন বোনার জন্য তো প্রয়োজন শক্তি, প্রয়োজন বেঁচে থাকা! নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা ভাগালো, দিনমজুর, নারী এবং যারা হাওরের ফসল উৎসবের কাজে সহযোগিতা করে শ্রম বিক্রি করে সারাবছরের খোরাকি কামাই করতেন, নিজেদের জীবনধারণের জন্য আয় উপার্জন করতেন তারা আজ ১৫ টাকা কেজি ধরে ৫ কেজি চাউলের জন্য সারাদিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ‘রিলিফ’ এর অপেক্ষা করছেন!

অথচ ধান রোপণের কয়েক মাসের ভেতরেই হাওরের মানুষ ফসল উৎসব করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন! বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাস ছিল ফসল কাটার উৎসবের মাস, ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো, ঘরে তোলা, বিক্রি, দাওয়াত খাওয়া, অনুষ্ঠান করা এসব স্বপ্ন বুনছিল সহজ সরল হাওরের মানুষ, হাওরের কৃষকরা। এই উৎসবের মাসে নারীদের কাজের ব্যস্ততায় কারো সাথে কথা বলার সুযোগ থাকতো না, কিন্তু আজ তাদের কাজ নেই! যারা ভাগালুরা হাওরে গিয়েছিলেন, গোয়ালা বেঁধে ধান কাটার প্রস্ততি নিয়েছিলেন তারা আজ বাড়িতে ফিরে আসছেন শূন্য হাতে, হতাশাকে সঙ্গী করে!

উৎসবের মাসে যেখানে তারা সারাবছরের খোরাক যোগানোর কথা সেখানে তারা আজ হাত, পা গুটিয়ে বসে আছেন সাহায্যের আশায়, ত্রাণের আশায়। অথচ তারা কোন সময়ই ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করতেন না বরং নিজের শক্তি, সামর্থ্য ও উদ্যমকে সঙ্গী করে কাজ করেই নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। আজ তাঁরা খুবই অসহায়, খুবই ক্লান্ত। তাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব তাই শুধু সরকারের নয়; আমাদের সবার দায়িত্ব।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এইচআর