ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 6 days ago

যেভাবে উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনীতির মাঠে!



বাংলা রিপোর্ট ডেস্ক:

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনীতির মাঠে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের ভিন্নধর্মী বক্তব্যে সরগরম হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। যেন নির্বাচনী আমেজ বইছে। রায়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ থাকলেও বিএনপিতে আনন্দ। রায়ের পর বিএনপি নেতাদের বক্তব্য, সরকারের অবস্থা নড়বড়ে। আর আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য, আবারও ষড়যন্ত্র চলছে। আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপি সুপ্রিমকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে ক্ষমতার সিংহদ্বারে পৌঁছে গেছে। গর্ত থেকে ওঠে আবার লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে।

শুক্রবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত অপশক্তিকে মোকাবেলায় মানসিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

আবার আমরা দুঃসময়ে পতিত হয়েছি, চক্রান্তের মুখে পতিত হয়েছি, আবারও ষড়যন্ত্র চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য এই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, একটি দল বিষধর সাপের মতো সুযোগ পেলেই ছোবল মারে। ইস্যুর পর ইস্যু খোঁজে, কিন্তু আন্দোলনে মাঠে থাকে না। সাড়ে ৮ বছরে কোনো আন্দোলন করতে পারেনি। আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে সুপ্রিমকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে মনে হয় ক্ষমতার সিংহদ্বারে পৌঁছে গেছে। গর্ত থেকে ওঠে আবার লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরাই আবার জয়ী হবো এবং সরকার গঠন করবো।

‘রায়ের সঙ্গে দেয়া পর্যবেক্ষণগুলোর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে মাঠে নামছে আওয়ামী লীগ। এজন্য ঢাকাসহ সারাদেশে দলের সমর্থক আইনজীবীদের মাধ্যমে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম,আলোচনা সভা করার মধ্য দিয়ে জনসচেতনতা ও জনমত তৈরির কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। দলের সম্পাদকমণ্ডলীর দুই সদস্য জানিয়েছেন, সারাদেশে আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত নেতাদের ঢাকা থেকে এ পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রথমে রায়ের সঙ্গে দেয়া পর্যবেক্ষণগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করেছেন।’

আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর কেউ কেউ বলেছেন, রায়ের চেয়ে পর্যবেক্ষণগুলোকে অনাহুত মনে করে সরকার। ফলে পর্যবেক্ষণ নিয়ে জনমত তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হিসেবে স্বীকৃত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন, রায়ের সঙ্গে দেয়া পর্যবেক্ষণ অনাহুত। এর মাধ্যমে ভিন্ন অভিপ্রায় রয়েছে বলে আমরা মনে করি। এর ফলে কিছু দায়িত্ব সরকারের ঘাড়ে এসে পড়ে। ফলে এখানে সরকারেরও নিশ্চয়ই কিছু করণীয় থেকে যায়। চিন্তা ভাবনা করে তা করা হবে ।

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের এক আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহাকে আগস্টের মধ্যে দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তিনি নিজে থেকে চলে না গেলে তার বিরুদ্ধে দু্র্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

কামরুল বলেন, প্রধান বিচারপতির যদি সামান্যতম জ্ঞান থাকে, সামান্যতম বুঝ থাকে তাহলে স্বেচ্ছায় চলে যাবেন। তা না হলে সেপ্টেম্বর মাস থেকে আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবেন। বিএনপির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, বিএনপির সুরে কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে বেশিদিন এই মসনদে থাকতে পারবেন না।

এদিকে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার এখন বিচার বিভাগের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। এই রায়ের যে অবজারভেশন, এটা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের কথা৷ সেটাই সুপ্রিমকোর্ট বলেছে৷ সুতরাং দেশের ১৬ কোটি মানুষ এই রায়ের অবজারভেশনের সঙ্গে আছে এবং তারা একমত।

মন্ত্রিসভায় যে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের কিছু মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা যে ভাষায় কথা বলছেন, জানি না তা আদালত অবমাননার দায়ে পড়ে কি-না৷

‘রায়ের এক জায়গায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে না হতে পারে তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।’ তিনি মনে করেন, সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণ আস্থা রাখতে পারছে না। এ দুটি প্রতিষ্ঠান যদি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ থেকে বিরত থাকে তাহলে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না।’

১১ আগস্ট শুক্রবার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পর সরকার বিচলিত হয়ে পড়েছে। তাদের অবস্থা এখন নড়বড়ে। তারা নানা রকমের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এ রায় তারা মেনে নিতে পারছে না। এমনকি জনগণের কাছেও যেতে পারছে না।

মওদুদ বলেন, মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা কারো ওপর ঈর্ষান্বিত হয়ে অথবা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে এ রায় দেননি। এ রায়ে গত নয় বছরে সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি মানুষের মনের দুঃখ-ব্যথা-বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে এ সরকারের শাসনের নালিশের কিছুটা প্রকাশ পেয়েছে। সরকার গণতন্ত্রের আদলে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিষয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দেয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে আদালতকে হেয় করে বক্তব্য দেয়ায় তিন দিনব্যাপী বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।

শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সুপ্রিমকোর্টকে হেয়প্রতিপন্ন করে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য প্রদানের প্রতিবাদে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি বিধিমালার গেজেট প্রকাশের দাবিতে আগামী রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার সারাদেশে সব বারে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম।

এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সর্বোচ্চ আদালতের রায় নিয়ে যে তিক্ত ও প্রতিহিংসামূলক সমালোচনা করেছেন, সেটা তার চাকরির আচরণবিধির পরিপন্থী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এ বি এম খায়রুল হক দেশকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকই দায়ী।

শুক্রবার এক আলোচনা সভায় নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, বিচার বিভাগকে প্রতিপক্ষ বানাবেন না। আর বানালেও লাভ হবে না। এতে দেশের ক্ষতি হবে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলায় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া রায় নিয়ে সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যের সমালোচনাও করেন তিনি।

তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় আশা-ভরসার স্থল সুপ্রিমকোর্ট ও তার আপিল বিভাগকে আওয়ামী লীগ ধমক দিচ্ছে। মন্ত্রীরা বলছেন, প্রধান বিচারপতিকে অক্টোবরের মধ্যে যেতে হবে। না হলে প্রধান বিচারপতিকে বিদায় করে দেয়ার ব্যবস্থা করব। এক চোখে আদা বেচবেন, আরেক চোখে লবণ বেচবেন, সেটা তো হবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যদি বলেন, সেটি স্বাধীনতার মতোই হতে হবে। সংসদ চাইলে বিচারপতিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচার করবে, অভিশংসন করবে, বাদ দিয়ে দেবে বা চাকরি খেয়ে দেবে—এমনটা কোথাও নেই।

আবদুর রব বলেন, ডাক্তারের কাছে রোগী গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেমন প্রেসক্রিপশন দেন, তেমনি প্রধান বিচারপতিও প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন। আপনাদের সার্জারির প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। টোটকা-ফাটকায় আর কাজ হবে না। তা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছেন। আপনাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আপনারা সংবিধানের, বিচার বিভাগের অসম্মান করেছেন।

বাংলা রিপোর্ট/এফএম