ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুর



নেত্রকোনা থেকে আবু হুরায়রা মিলকী:

সোমেশ্বর পাঠকের নামানুসারে- যিনি কিনা এক সুদর্শন ব্রাহ্মণ। কামাখ্যা তীর্থ দর্শন শেষে গারো পাহাড়ের পাদদেশে এক জলধারার তীরে বিগ্রহ লক্ষ্মী নারায়ণজির আবাসস্থল নির্ধারণ করেন। পরবর্তীকালে স্থানীয়দের অনুরোধে অত্যাচারী বৈশ্য রাজাকে পরাস্ত করে নতুন রাজধারা প্রতিষ্ঠিত করেন। এক সিদ্ধ পুরুষ তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। ফলে যা দাঁড়ায়, মহাপুরুষের সৎসঙ্গ ও সদুপদেশে এ রাজ্যের উৎপত্তিবলে এর নাম সুসঙ্গ। রাজবংশের আদি পুরুষ সোমেশ্বর পাঠকের নামানুসারেই এর নামকরণ করে সুসং দুর্গাপুর।

 

এক সময় ইতিহাসসমৃদ্ধ এই সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। আজ রাজাও নেই রাজ্যও নেই। তবে রয়েছে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মত অনেক কিছু। হাজং আদিবাসীদের টংক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত নেতা কমরেড মনিসিংহ এই দুর্গাপুরেই জন্মগ্রহণ করেন।

 

সুসং দুর্গাপুর নেত্রকোনা জেলার উত্তর প্রান্তে গারো পাহাড়ের পাদদেশের এক জনপদের নাম। যেখানে রয়েছে আকাশছোঁয়া সবুজ পাহাড়। বয়ে গেছে টলমলে জলের সোমেশ্বরী নদী। ছোট্ট একটি জায়গা হলেও যার পরতে পরতে জরিয়ে রয়েছে সৌন্দর্য। এখানে দেখার মতো আছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি, সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, গারো পাহাড়,  টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ,  সাদা মাটির পাহাড়, লেঙ্গুরা সাত শহীদের মাজার।

 

সোমেশ্বরী নদী

এই নদী সম্পর্কে প্রচলিত আছে ১৯৬২ সালের আকস্মিক এক ঢলের মাধ্যমে এর উৎপত্তি, যার কারণে এক রাতের মধ্যে দুই পাড়ের অসংখ্য বসতি নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। সোমেশ্বরী আরও দূরে গিয়ে মিলেছে ধনু নদীর সাথে। এটি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারেই তার নাম সোমেশ্বরী। সোমেশ্বরী নদী স্বচ্ছ পানি আর ধুধু বালুচরের জন্য বিখ্যাত। এটি নেত্রকোনা জেলায় প্রবাহিত অন্যতম নদী। মেঘালয় রাজ্যের বাগমারা বাজার হয়ে বাংলাদেশের রানীখং পাহাড়ের পাশ দিয়ে সোমেশ্বরী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে স্থানীয়রা বালু-মাটি সরিয়ে ‘কালো সোনা’ উৎপাদন করেন।

মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য ইউরেনিয়ামের প্রাচুর্যও রয়েছে সোমেশ্বরীতে। এই নদীর পানিতে নেমে পায়ে বালির স্পর্শ পাওয়ার অনুভূতিটা দারুণ। আপনি চাইলে কম খরচেই ছোট মাঝারি সাইজের নৌকা অথবা মোটরসাইকেল দিয়ে দুর্গাপুর শহর থেকে বিজয়পুর পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারেন। আর যারা ইট পাথর শহরে চার দেয়ালে বেড়ে উঠা তাদের ভেতরের অনুভূতিকে জাগ্রত করে তুলতে পারে। এ নদীর সরল চাপরাশির তীব্র সৌন্দর্য।

 

আর এরপরেই পাবেন গারো পাহাড়

সুসং দুর্গাপুরের উত্তর সিমান্তে বিজয়পুর,ফারংপাড়া,ডাহাপাড়া, নলুয়াপাড়া, বাড়মাড়ি, ভবানিপুর ও রানিখংসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এর বিস্তার। এই পাহাড়গুলো প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্যে ভরপুর। এই পাহাড়কে সাজাতে প্রকৃতি যেন নিজেকে উজার করে দিয়েছে। সেখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণের  শালগাছ, পাহাড়-পর্বত, ছোট-ছোট নদী, পাহাড়ি ঝর্ণা, গজারিসহ নানা প্রজাতির গাছ, সৌন্দর্য বেষ্টিত উঁচু-নিচু পথ দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখার মজাই আলাদা। সবুজের অপার সমা

রোহ এই গারো পাহাড়। কোথাও কোথাও পাহাড়ের গায়ে দেখা যায় ছোটছোট কুঁড়েঘর। পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা। যার স্বচ্ছ জলরাশিতে নিজের চেহারা অবলোকন করা যায়। দুই পাহাড়ের মাঝে সমতল ভূমি। সমতল ভূমিতে সবুজ শস্যক্ষেত। সবুজ গাছের ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ। পাহাড়ে পায়ে চলার দুর্গমপথে চলাচল করে পাহাড়ি মানুষ।।  অপার সৌন্দর্যের এ পাহাড় চোখ জুড়িয়ে দেয় যেকোনো পর্যটকেরই। এ এলাকায় অন্যান্যদের মধ্যে বসবাস করে বিভিন্ন শ্রেণীর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন। তার মধ্যে গারো, হাজং, কোচ, মুরং উল্লেখযোগ্য।

 

বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি

দুর্গাপুর পৌরশহরে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন  অবস্থিত ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীদের বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি। উপজাতিদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করার জন্য এটি ১৯৭৭ সনে তৎকালীন জিয়াউর রহমানের আমলে স্থাপিত উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি সংস্কৃতিমনাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে এটি জাতীয় সংসদ কর্তৃক ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি নামে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।পরিচালকসহ ১৭ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা একাডেমিটি পরিচালনা করেন।

 

এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নানা নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে। তারা সেখানে বিভিন্ন সময় তাদের উৎসব নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা করে। সুসং দুর্গাপুর ও এর আশপাশের উপজেলা কলমাকান্দা, পূর্বধলা, হালুয়াঘাট এবং ধোবাউড়ায় বসবাস করে গারো, হাজং, ডালু, কোচ, বানাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী।

 

চীনাোটির পাহাড় বা সাদামাটির পাহাড়

দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়াপাড়া ও মাইজপাড়া মৌজায় বিজয়পুরের শসার পাড় ও বহেরাতলী গ্রামে সাদামাটি অবস্থিত। যার বুক চিরে জেগে ওঠেছে নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। সাদামাটি পানির রঙটাকে যেন আরো বেশি গাঢ় করে দিয়েছে। এই অঞ্চলের আনুমানিক প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন সাদামাটি বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ বছরের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। সাদা, গোলাপি, হলুদ, বেগুনি, খয়েরি, নীলাভসহ বিভিন্ন রঙের  মাটি, পানি ও প্রকৃতির নজরকাড়া সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়।

যাতায়াত
যারা ঢাকা থেকে বাসে যেতে চান তারা মহাখালী থেকে বাসে সরাসরি সুসং দুর্গাপুর অথবা কমলাপুর থেকে ট্রেনে বলাকা কমিউটারে পূর্বধলার জারিয়া স্টেশনে নেমে সিএনজি করে সরাসরি সুসং দূর্গাপুরে যেতে পারবেন। বাস ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকা। আর ট্রেনে ৭৫ টাকা এরপর সিএনজি নিবে জনপ্রতি ৩০-৫০ টাকা (অবস্থার আলোকে)।

আর যারা ময়মনসিংহ থেকে দুর্গাপুর যেতে চান তারা ময়মনসিংহ ব্রিজ থেকে সিএনজি করে দুর্গাপুর অথবা ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে ট্রেনে জারিয়া স্টেশনে নেমে সিএনজি করে সুজা দুর্গাপুরে যেতে পারবেন। তবে বর্তমানে শ্যামগঞ্জ টু দুর্গাপুর ৩৫ কিলোমিটার রাস্তায় ভারি বালু এবং কয়লার ট্রাক চলাচল করায় সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। তবে বাস থেকে ট্রেনে যাওয়াই বেশি নিরাপদ। বাসের ভাড়া ১০০ টাকা ট্রেনে ২৫ টাকা, সিএনজি ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত।

 

দুর্গাপুর বাসস্ট্যান্ড নেমে চাইলে গেস্ট হাউসে উঠতে পারেন। আর না হয় সুসং দুর্গাপুর বাজার থেকে রিক্সায় বা মোটরসাইকেল নিয়ে প্রথমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি অবলোকন করে রওয়ানা দিতে পারেন সোমেশ্বরী নদীপার ঘেঁষা গারো পাহাড়, সাদা মাটির পাহাড়, নীল পানির লেকের দিকে। সেখানে ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার ছাড়াও দেখার মতো রয়েছে সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ট্রেনিং নেয়ার জন্য কয়েকটি পিলার। সারাদিনের জন্য রিকশা অথবা মোটরসাইকেল ভাড়া করে ঘুরে আসতে পারেন পুরো দুর্গাপুর যেখানে আপনাকে খরচ করতে হবে মাত্র ৩০০-৬০০ টাকা (যার কাছে যা রাখতে পারে)।

 

থাকাখাওয়া বাড়িফেরা

এখানে বিভিন্ন মানের গেস্ট হাউস আছে। জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, ইয়ুম মেন খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন রেস্ট হাউজ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি গেস্টহাউজ রয়েছে। যেখানে রুম ভাড়া পড়বে ৮০০ টাকা। এ ছাড়া এখানে কিছু মধ্যমমানের হোটেল আছে। হোটেল গুলশান, হোটেল জবা, হোটেল সুসং, স্বর্ণাগেস্ট হাউজ, , , , নদী-বাংলা গেস্ট হাউসে ২০০-৪৫০ টাকার মধ্যে থাকা যায়। যদিও এখানে পাওয়া যাবে না ফাইভস্টারের খাবার কিন্তু এত আতিথেয়তায় চ্যাপা শুঁটকি মাছভর্তা থেকে শুরু করে মাছ মাংসসহ সবকিছুতেই পাওয়া যায় ঘরোয়া রান্নার স্বাদ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সারিবদ্ধভাবে সাজানো সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ ও নীল পানির নদী সোমেশ্বরী, দিগন্ত বিস্তৃত বালুচর যে কাউকে মুগ্ধ করবে। তাই এই অপরূপ সৌন্দর্যবেষ্টিত সুসং দুর্গাপুরের ছোয়া পেতে আজই চলে আসুন নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে।

 

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এমএকে