ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 4 months ago

‘হেলেনকেলার’ জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ মঞ্চায়ন



বিনোদন ডেস্ক:

গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় মহীয়সী নারী হেলেন কেলারের জন্মদিনকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে স্বপ্নদলের নতুন নাটক হেলেন কেলার-এর বিশেষ মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হলো।

 
হেলেন কেলারের জীবন-কর্ম-স্বপ্ন-সংগ্রাম-দর্শনভিত্তিক মনোড্রামা হেলেন কেলার রচনা করেছেন অপূর্ব কুমার কুন্ডু। নির্দেশনা দিয়েছেন জাহিদ রিপন। অভিনয় করছেন জুয়েনা শবনম।

 

 

হেলেন কেলারের ১৩৬তম জন্মবার্ষিকী ছিল গত ২৭ জুন। তাঁর জন্মদিন সারা বিশ্বেই বিশেষ মর্যাদায় ‘হেলেন কেলার ডে’ হিসেবে পালন করা হয়।

 

জন্ম ও শৈশব

হেলেন কেলার ১৮৮০ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আর্থার কেলার এবং মায়ের নাম কেইট অ্যাডামস। মাত্র ১৯ মাস বয়সেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মা-বাবা প্রাণপ্রিয় কন্যার জীবনের আশা-ভরসা ছেড়ে দিলেও একেবারে ভেঙে পড়েননি। হেলেনের চিকিৎসা করা শুরু করেন। বহু চিকিৎসার পর হেলেনের জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু তার কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়।

 

গ্রাহাম বেলের পরামর্শ

হেলেনের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন মা-বাবা তাকে ওয়াশিংটনের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে পরামর্শের জন্য নিয়ে যান। গ্রাহাম বেল হেলেন কেলারকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, মেয়েটি আর কোনোদিন চোখে দেখতে পাবে না এবং কানেও শুনতে পাবে না। তবে গ্রাহাম বেল হেলেন কেলারের তীক্ষè বুদ্ধিমত্তা অনুধাবন করে বলেন- পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে মেয়েটি।

 

শিক্ষাজীবন

হেলেনের আট বছর বয়সে অ্যানি সুলিভান নামের এক গৃহশিক্ষিকা পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। এখানে থেকেই তাদের ৪৯ বছরের সম্পর্কের শুরু। অ্যানি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। অ্যানি প্রথমে আঙুল দিয়ে হেলেনের হাতে বিভিন্ন চিহ্ন এঁকে এবং এরপর বর্ণমালা কার্ড দিয়ে বর্ণমালা শেখান। তারপর ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করান। ১০ বছর বয়সে নরওয়েতে উদ্ভাবিত এক পদ্ধতি অনুসরণ করে কথা বলা শেখেন হেলেন। ১৯০০ সালে হেলেন রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বিশ্বখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ১৯০৪ সালে হেলেন প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে  স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগেই তার আত্মজীবনী দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ প্রকাশিত হয়।

 

সমাজসেবা

সমাজে তার মতো আরও যারা বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছেন- তাদের জন্য কিছু করার মানসিকতা তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল। তিনি এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণমানুষের সহায়তা অর্জনে সচেষ্ট হন। এতে ব্যাপক সাফল্যও পান। তার জীবদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, মার্ক টোয়েন, চার্লি চ্যাপলিনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সহায়তা পেয়েছেন। হেলেন ১৯১৫ সালে জর্জ কেসলারকে সঙ্গে নিয়ে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি এখনও বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

 

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন। ১৯৫৯ সালে হেলেন কেলার জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।

 

সঙ্গীতপ্রেমী হেলেন

তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী ছিলেন অথচ স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতে পারতেন। তার সঙ্গীত উপভোগ করার আশ্চর্য পদ্ধতি ছিল। তিনি বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলে দিতে পারতেন তাতে কী ধরনের সুর বাজছে। আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তায় হাতের স্পর্শ দিয়ে তিনি শ্রবণের কাজ করতেন। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কী সঙ্গীত গাইছেন তারা। তার এমন আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহুদিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়।

 

অদ্ভুত আরও গুণ

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি নৌকা চালাতে পারতেন খুব ভালো। নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন। দাবা ও তাস খেলতে পারতেন। ঘরে বসে নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারতেন। নিজের নৌকা চালনা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি খুব একটা নিশানা ঠিক রাখতে পারি না। সচরাচর অন্য কেউ পাছ-গলুই সামলায় আর আমি দাঁড় ফেলি। হামেশা আমি হাল ছাড়াই যাই নৌকা বাইতে। তখন জলডোবা ঘাস, শাপলা আর পাড়ের ঝোপঝাড়ের গন্ধে দিক ঠিক করতে হয়। দারুণ মজার ব্যাপার! আমার দাঁড়গুলোয় চামড়ার ব্যান্ড লাগানো আছে। এ কারণে পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে না। বৈঠা ঠেলতে কতটা জোর লাগছে তার ওপর নির্ভর করে আমি বুঝতে পারি দাঁড় ঠিকমতো পড়ছে কি না। একইভাবে স্রোতের বিপরীতে কখন চলেছি তাও টের পাই। বাতাস আর ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে আমার ভালো লাগে।’

 

রাজনীতি

হেলেন রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও লেখালেখি করেছেন। তিনি ছিলেন আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির সমর্থক। এ পার্টিতে যোগ দেন ১৯০৯ সালে। তিনি আয়ের সুষম বণ্টন দেখতে চাইতেন। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই ছিল তার ইচ্ছা। তার বই ‘আউট অব দ্য ডার্ক’-এ এ ইচ্ছার কথা লিখে গেছেন তিনি। প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ইউজিন ভি ডেবসের সমর্থন পেয়েছিলেন। ১৯১২ সালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ডে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একজন প্যাসিফিস্ট এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার ঘোর বিরোধী ছিলেন।

 

চলচ্চিত্রে হেলেন কেলার

বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জীবনের বিড়ম্বনা ও দুঃখ-দুর্দশাকে উপজীব্য করে নির্মিত ডেলিভারেন্স চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন হেলেন কেলার। ট্রেভলিন মিলার রচিত এ নির্বাক ছবি পরিচালনা করেন জর্জ ফস্টার প্ল্যাট। এ ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি নিজেই।

 

তার চলে যাওয়া

১৯৬৮ সালের ১ জুলাই হেলেন কিলার চলে যান পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। তার স্মৃতি অম্লান করে রাখার জন্য আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হয় হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল।

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/এইচএম