ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 3 months ago

গ্রীক দেবির ফিরে ফিরে আসা



গ্রীক পুরাণ খ্যাত ন্যায়বিচারের প্রতীক ‘থেমিস’ ‘স্থাপন, ‘অপসারণ’ ও পুন:স্থাপন নিয়ে দেশে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট মূল ফটকে ‘থেমিস’ আদলে নারীমূর্তি স্থাপন করা হয়। এ নিয়ে হেফাজতে ইসলামীসহ দেশের অন্যান্য কয়েকটি ইসলামী সংগঠন বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করত: এ দেবির মূর্তি অপসারণের দাবি উত্থাপন করে। এসব সংগঠন কমবেশি আন্দোলন করে। হেফাজত হুমকি দেয়- রমজানের আগে এই দেবি অপসারিত না হলে তারা ‘শাপলা চত্বরের’ অনুরূপ সরকারবিরোধী সমাবেশ করবে। গত এপ্রিল মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে হেফাজত নেতৃবৃন্দের বৈঠকে এ প্রসঙ্গ এলে প্রধানমন্ত্রী সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ওই ‘দেবি’র মূর্তি অপসারণ বিষয়ে সহমত পোষণ করেন ও প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিনিময় করেন মর্মে খবরে প্রকাশ।

তথ্যে জানা যায়, প্রধান বিচারপতি বিচারক, বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ন্যায়বিচারের প্রতীক খ্যাত ওই ‘মূর্তি’ মতান্তরে ভাস্কার্য অপসারণ। গত বৃহস্পতিবার রাত্রে ‘মূর্তি’টি অক্ষত অপসারণ করে হাইকোর্টের এ্যানেক্স ভবনের পার্শ্বে রাখা হয়। দেবির অপসারণের পর ইসলামী সংগঠনগুলোর মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হয়। তারা দেবির অপসারণকে তাদের ‘প্রাথমিক জয়’ বলে আখ্যা দেয়।

অন্যদিকে প্রগতিশীল পরিচিত বামপন্থী কতিপয় রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন উষ্মা প্রকাশ করে। ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মী বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় বিক্ষোভ করে। তাদের কতিপয় নেতাকর্মী আটক করে মামলা দিয়ে ‘হাজতবাসে’ পাঠানো হয়। দেশে ও বিদেশের কিছু স্থানে বামপন্থী সংগঠন দেবির অপসারণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। মূর্তিটির নির্মাতা শিল্পী মৃনাল হক এই ন্যায়বিচারের ‘দেবি’ অপসারণে বিমর্ষ হয়ে পড়েন ও মায়ের মৃত্যুর চেয়ে অধিক কান্নায় শোক বিহ্বল হন মর্মে কোনো কোনো গণমাধ্যমে তার উদ্ধৃতি দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। অত:পর আচমকা শনিবার রাত ৮.০০ থেকে ‘গ্রীক দেবি’র পুন:স্থাপন শুরু হয় হাইকোর্টের এ্যানেক্স ভবন সম্মুখে। যা গভীর রাত্রে সুসম্পন্ন হয়। শনিবার সন্ধ্যা থেকে ভাস্কর মৃণাল হকের উদ্ধৃতি সূত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে, ‘দেবি’কে এ্যানেক্স ভবনের সম্মুখে পুন:স্থাপন প্রক্রিয়া চলমান। দেবিকে পুন:স্থাপনের খবর শ্রবণান্তে দু-একটি ইসলামী ছাত্র সংগঠন রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। রোববার মূর্তিটি পুন:স্থাপনের সংবাদে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রোববার দিনব্যাপী এই গ্রীক দেবির প্রত্যাবর্তনে রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজে উত্তাপের ডালপালা বিস্তৃত হয়। রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে হেফাজতে ইসলামীর আমীর মাওলানা শাহ আহমদ শফি রাজধানী একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, ‘থেমিস অপসারণে যখন আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলাম। রমজানের আগেই কোনো সংঘাত ছাড়াই থেমিস অপসারণে ভেবেছিলাম সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে, ঠিক তখন মুসলমানের কাছে অতি পবিত্র মাস রমজানের প্রথম রাত্রে ‘থেমিস’কে পুন:স্থাপন করে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। মাত্র দুই দিনের মাথায় দেশবাসী রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস পবিত্র রমজানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছি, প্রথম রোজার তারাবিহ আদায় করে প্রশান্ত চিত্তে ঘরে ফিরেছিল, তখনই দেশবাসীর সাথে আমিও জানতে পারলাম থেমিস সুপ্রিমকোর্টের এ্যানেক্স ভবনে পুন:স্থাপিত হয়েছে। এমন সংবাদে সমগ্র দেশবাসীর সঙ্গে আমরা বিস্মিত, হতবাক এবং বাকরুদ্ধ। আমাদের সকল আবেদন নিবেদন এবং শান্তিপূর্ণ দীর্ঘ আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে থেমিসের পুন:স্থাপন এটাই প্রমাণ করে এদেশের মানুষের সম্মিলিত আশঙ্কাকে সরকার বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছে না। থেমিস সুপ্রিমকোর্টের সামনে থাকবে, নাকি পেছনে থাকবে, এটা কোনো ইস্যু কখনো ছিল না। নামাজের সময় কালো কাপড়ে মুড়ে দেয়া হবে কিনা, এটাও ইস্যু ছিল না। ইস্যু ছিলো থেমিস থাকবে কিনা। এইখানে মধ্যপন্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ হেফাজতের আমীর মাওলানা শাহ আহমদ শফির বক্তব্য স্পষ্ট- ‘ইস্যু ছিল থেমিস থাকবে কি থাকবে না।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ জমিয়াতুল উলামা চেয়ারম্যান আল্লামা ফরিদউদ্দীন মাসউদ গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, ‘বর্তমানে ভাস্কর্য বনাম মূর্তি নিয়ে প্রধান বিচারপতির আচরণে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন বলে অনুমেয় । জাতি হতাশ, এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগ করে জাতিকে মুক্তি দেবেন বলে আশা করি।’

মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদ বর্তমান সরকারপন্থী উলামা নেতা হিসেবে খ্যাত। মাওলানা মাসউদের বক্তব্য যদি তার দলের কথা হয়, তবে প্রধান বিচারপতির ‘থেমিস’ নিয়ে ‘ভূমিকা’ বিশ্লেষণে বলার কোনো অবকাশ থাকে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ ‘নির্বাহী বিভাগ, ‘বিচার বিভাগ, ‘আইন বিভাগের’ কোন প্রান্তরে, অভ্যন্তরে, ‘থেমিস’ দেবির মত কোনো ‘ভাস্কর্য’ হোক বা “মূর্তি’ স্থাপনে এই বিভাগ পৃথক সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারী কীনা? থেমিস অপসারণের পর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সুপ্রিমকোর্টের সামনে স্থাপিত গ্রীক মূর্তি অপসারণের ক্ষমতা সরকারের কোনো এখতিয়ারে নেই, এটি সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্ত। গ্রীক দেবি অপসারণে সরকারের কোনো বিষয় নয়, এটা একেবারে কোর্টের এখতিয়ার।’ জনাব ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে অনুমিত যে, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ সকল ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক সিদ্ধান্ত নিতে বর্তমানে এখতিয়ারবান। আমরা জানি আইন প্রণয়ন করে আইন বিভাগ, সে আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করে বিচার বিভাগ আর আইন সমাজে প্রয়োগ করে নির্বাহী বিভাগ। সুপ্রিমকোর্টে ‘থেমিস’ দেবি স্থাপন দেশের নিম্ন কোনো আদালত, হাইকোর্ট বেঞ্চ বা সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের কোনো বেঞ্চ বা পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের কোনো রুলিং বা রায়ের বাস্তবায়ন কীনা? জনাব ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে এ ধরনের আভাস পাওয়া গেলেও এ ধরনের কোনো রুলিং সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ বা আপিল বেঞ্চ সূত্রে দেয়া হয়েছে কিনা, তা গণমাধ্যম বা অন্য কোনো সূত্রে খবর প্রকাশিত হয়নি।

হেফাজতের আমীর বক্তব্যে ‘থেমিস’ অপসারণে, পুন;স্থাপনে সরকারের নিকট ইস্যু উত্থাপন কর। এখন প্রশ্ন হেফাজতসহ কতিপয় ইসলামী দল কেন ‘থেমিস’ অপসারণের জন্য, পুন:স্থাপনে প্রতিক্রিয়াশীল।

অন্যদিকে কতিপয় বামপন্থী সংগঠন হেফাজত বা ইসলামী দলের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে প্রগতিশীল, সুশীল সমাজখ্যাত কিছু সদস্য বামপন্থী কতিপয় সংগঠনের সঙ্গে ঐক্যতালে কেন সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে ‘থেমিস’ দেবি রাখার পক্ষে? দেবি সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে বিদ্যমান থাকলে দেশের জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে কী সুবিধা হবে আর না থাকলে কী অসুবিধা হবে? হেফাজতের দাবি অনুযায়ী কেনইবা এই থেমিস দেবির অপসারণ আবশ্যক? আর কে- বা এই থেমিস? বিচারের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক? মুসলমানের – ‘থেমিসে’র দ্বন্দ্বই বা কী?

চলবে……

বাংলা রিপোর্ট ডটকম/মসি খাঁ