ব্রেকিং নিউজঃ

Published: 3 months ago

বাংলা খাবার



উৎসব-পার্বণে ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাদ্যতালিকায় রসগোল্লা, নকশিপিঠা, কদমা-বাতাসা, ভর্তা, আচার, খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস অনিবার্য। পালা-পার্বণ, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবে এসব সুস্বাদু খাবার শত বছর ধরে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে

 

রসগোল্লা

‘রসের গোলক এত রস তুমি ধরিয়াছ হায়, ইতালির লোকধর্ম ভুলিয়া লুটাইল তব পায়। ’ ‘রসগোল্লা’ গল্পে এভাবেই রসগোল্লার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। রূপলাবণ্য আর স্বাদের কারণে মিষ্টির দুনিয়ায় রসগোল্লা অনন্য। সাদা রংই এর আভিজাত্য। মধ্যযুগে কৃত্তিবাসের জন্মভূমি ফুলিয়ার হারাধন ময়রা রসগোল্লা আবিষ্কার করেন। ১৮৬৮ সালে কলকাতার বাগবাজারের নবীনচন্দ্র রায়ের স্পঞ্জ রসগোল্লা আবিষ্কারের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দেশের সর্বত্র রসগোল্লা তৈরি ও বিক্রি হয়। যশোরের জামতলা, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, ঢাকার সাভারের রসগোল্লার বিশেষ সুনাম আছে।

প্রাচীনকালে ‘গুড়জল’ দিয়ে অতিথিকে মিষ্টিমুখ করানো হতো। আখ, খেজুর, তালের গুড়, মিছরিই ছিল মিষ্টি। মধ্যযুগে ছানা আবিষ্কৃত হলে মিষ্টি বিপ্লব শুরু হয়। দুধ দিয়ে ছানা তৈরি করে সেই ছানা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরি শুরু হয়। এই মিষ্টি বিপ্লবের অন্যতম ফসল রসগোল্লা। রসগোল্লার পথ ধরে পরে এসেছে রাজভোগ, রসমালাই, দানাদার, ছানার মুড়কি, ক্ষীরমোহন।

নকশিপিঠা

বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত নকশিপিঠা। নানি, দাদি, মা-বোনরা তাঁদের মন থেকে পাখি, ময়ূর, মাছ, ফুল, লতা-পাতা, পুতুল, বর-বউ নকশিপিঠায় ফুটিয়ে তোলেন। চালের গুঁড়া, ময়দা, মুগ ডাল, চিনি, নারিকেল ও তেল দিয়ে নকশিপিঠা তৈরি হয়। মিষ্টি স্বাদের নকশিপিঠা তৈরির চল দেশের প্রায় সব জেলায় রয়েছে। তবে কেউ কেউ ঝাল ও নোনতা স্বাদের নকশিপিঠাও তৈরি করেন। আতপ চালের গুঁড়া সিদ্ধ করে কাঁই দিয়ে তৈরি হয় মোটা রুটি। তারপর খোঁপার কাঁটা, খেজুরকাঁটা, সুঁই, পাটকাঠি, ঝাঁটার কাঠি দিয়েতৈরি করা হয় বিভিন্ন আকার-আকৃতির  নকশিপিঠা। তেলে ভেজে চিনির সিরায় ডুবিয়ে খাওয়ার উপযোগী করা হয়। নকশিপিঠাকে জামাই-ভোলানো পিঠা, বিবিয়ানা পিঠাও বলা হয়। এ ছাড়া নকশা অনুযায়ী নকশিপিঠার বিভিন্ন নাম রয়েছে; যেমন—শঙ্খলতা, কাজললতা, চিরণ, হিজলপাতা, কন্যামুখ, জামাইমুখ, চম্পাবরণ ইত্যাদি।

পায়েস

পায়েস, ফিরনি, ক্ষীর একই ধরনের রান্না করা মিষ্টি খাবার। গুড়, চিনি, দুধ, আতপ চাল দিয়ে পায়েস রান্না হয়। পায়েসের স্বাদ বাড়ানোর জন্য নারিকেল, নলেন গুড়, তেজপাতা, এলাচ গুঁড়া, কিশমিশ, জাফরান, পেস্তাবাদাম, কাজুবাদাম, কমলার খোসা ব্যবহার করা হয়। দুধের পায়েস ছাড়াও ছানার পায়েস, সুজির পায়েস, রসের পায়েস, সেমাই পায়েস, গাজর পায়েস, পাতাকপির পায়েস, কচি লাউয়ের পায়েস অনেকের কাছে অতি প্রিয়। গরুর দুধ জ্বালিয়ে তার মধ্যে খুসবুময় ভেজানো আতপ চালের গুঁড়া ও গুড় বা চিনি দিয়ে রান্না করা হয় সুস্বাদু পায়েস। কাটারিভোগ, কামিনী, গোবিন্দভোগ, বেগুনবিচি, দাদখানি, খিরকুনি, কালিজিরা চালের পায়েস ভালো হয়।

খই

ধানের ফুল হচ্ছে খই। ধবধবে সাদা রঙের খই বাঙালির হৃদয় রাঙায়। আম-কাঁঠালের সঙ্গে খই, দুধে ভেজানো খই, গুড়মিশ্রিত খই খাদ্যতালিকায় অনেক আগে থেকেই আছে। কথায় আছে, বিন্নি ধানের খই আর শালি ধানের মুড়ি। একসময় এই দেশে শুধু বিন্নি ধান দিয়েই খই ভাজা হতো। এখন বিন্নি ধান ছাড়াও কালিজিরা, বেতি, পরাঙ্গি ধানে ভালো খই হয়। ধানের পাশাপাশি ভুট্টার খই, ঢ্যাপের খই বলে আরো দুই রকম খই রয়েছে। আতপ ধান কড়া রোদে শুকিয়ে খই তৈরি করা হয়। এরপর চুলায় মাটির হাঁড়ি দিয়ে ওই হাঁড়ির এক পাশে চুলার মতো একটি মুখ তৈরি করা হয়। হাঁড়িতে বালু গরম করে তার মধ্যে শুকনা ধান দিয়ে বাঁশের কাঠি, ঝাঁটার কাঠি দিয়ে নাড়তে হয়। নাড়ার একপর্যায়ে তৈরি হয়ে যায় খই। পরে খইয়ের সঙ্গে লেগে থাকা ধানের খোসা চালনিতে চেলে আলাদা করা হয়।

কদমা-বাতাসা

জনপ্রিয় মিষ্টি খাবার কদমা ও বাতাসা। কদম ফুলের মতো দেখতে এই মিষ্টির নাম কদমা। ভেতরে ফাঁপা ধবধবে সাদা রঙের কদমা তৈরি হয় চিনি ও ময়দা দিয়ে। এক থেকে ছয় সেন্টিমিটার ব্যাসের কদমা পাওয়া যায়। সিলেট অঞ্চলে কদমা ‘তিলুয়া’ নামে পরিচিত। রাজশাহীতে ফুটবল আকারের কদমার দেখা মেলে।   বাংলার আরেক জনপ্রিয় মিষ্টি খাবার বাতাসা। দুই থেকে চার সেন্টিমিটার ব্যাসের চ্যাপ্টা আকারের এই মিষ্টি চিনি ও গুড় দিয়ে তৈরি হয়।   গুড়ের সুস্বাদু বাতাসা হারিয়ে গেলেও চিনির সাদা রঙের বাতাসা এখনো স্মৃতি হয়নি। দুই কাপ চিনি বা গুড়, আধা কাপ পানি, আধা চা চামচ খাবার সোডা একসঙ্গে মিশিয়ে লোহার কড়াইয়ে জ্বাল দিতে হয়। এরপর দুধ দিয়ে ফেনা পরিষ্কার করে ঘন ঘন নাড়া হয়। একপর্যায়ে মিশ্রণটি গাঢ় সিরায় পরিণত হয়। বাঁশের ডালায়, কাপড়ে সেই সিরা জমিয়ে তৈরি করা হয় বাতাসা। বাতাসা ছাড়াও মুড়ি-বাতাসা অনেকের কাছে প্রিয়।

 

ভর্তা

বাঙালির রসনাতৃপ্তিতে ভর্তা বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অনেক বাঙালি পরিবারে ভর্তা অত্যাবশকীয়। হাতের সাহায্যে কিংবা শিলপাটায় বেটে ভর্তা তৈরি হয়। তবে ভর্তার গুণগানের সঙ্গে মরিচ, রসুন, খাঁটি সরিষার তেল জড়িত। আলু, পটোল, বরবটি, শিম, মিষ্টি আলু, ডাল, টমেটো, বেগুন, ডিম, শুঁটকি মাছ, পুদিনাপাতা, ধনেপাতা, লাউয়ের খোসা, চিংড়ি, কচু, ঢেঁড়স, মরিচ, কালিজিরা, সরিষা, কাঁচকলা, ডাঁটাশাক, মটরশুঁটি, লাউপাতা, আম, পেয়ারা, বড়ি, রসুন, মিষ্টি কুমড়া, পালংপাতা, ফুলকপি, পেঁয়াজপাতা, কাঁঠালের বিচি, মটরশাক, ওল, মানকচু, টাকি মাছ, কুলবরই, কাঁচা আমের ভর্তা তৈরিতে বাঙালি গৃহবধূরা সিদ্ধহস্ত।